আজ ২৪ এপ্রিল। দেশের শিল্প ইতিহাসের বিপর্যয়কর ও বিভীষিকাময় এক দিন— ৩ বছর আগে এ দিনেই সাভারে রানা প্লাজা ধসে মারা যান পাঁচ গার্মেন্টসের হাজারের বেশি শ্রমিক।
আহত হাজারো শ্রমিকের মধ্যে অনেকেই পঙ্গু হয়ে গেছেন চিরতরে। নাম-পরিচয়হীনভাবে দাফন হয় দুই শতাধিক শ্রমিকের। বহু পরিবার হারায় স্বজন এতিম হয় কয়েক'শ শিশু-কিশোর।
ভবনমালিক সোহেল রানা ও কতিপয় গার্মেন্টস মালিকের অনিয়ম, অদূরদর্শিতার বলী হয় বিশ্বময় সুনাম কুড়ানো রপ্তানিমুখী তৈরিপোশাক শিল্প। তবে ৩ বছর পেরুলেও হতাহতদের ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও কর্মসংস্থান; কারখানার কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকদের জীবনমান নিশ্চিত এবং জড়িতদের বিচার ও শাস্তি এর সবকিছুই এখনো প্রক্রিয়াধীন।
মেশিন চলছে অবিরাম সেইসঙ্গে অন্তহীন ছুটে চলছে জীবনের চাকাও সচল দেশের অর্থনীতি। তৈরি পোশাক খাতের এসব শ্রমিকের ঘামেই অর্জন দেশের রপ্তানি আয়ের শতকরা ৮১ ভাগ।
২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল আরো শ্রমজীবীদের মতো সাভারের রানা প্লাজার পোশাক শ্রমিকেরাও কাজে এসেছিলেন জীবিকার তাগিদেই। কিন্তু হঠাৎই থমকে যায় হাজারো পরিশ্রমের হাত। লাশ হয়ে তারা জানান দিল শ্রমঘন সেই তৈরি পোশাক শিল্পে কতো আচমকা বিপর্যয় তাদেরকে মুহূর্তেই নিস্তব্ধ করে দেয়।
বিকট শব্দে ধসে পড়ে ধ্বসস্তুপে পরিণত হয়ে সেই বিভীষিকার ইতিহাসই তৈরি করলো সাভারের নয় তলা ভবন রানা প্লাজা। শ্রমিকের আর্ত চিৎকারে ভারী হয়ে উঠেছিল চারপাশ শোকবিহ্বল সারাদেশ। এ আর্তচিৎকার দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে।
সাহায্যের হাত বাড়ায় শত শত সাধারণ মানুষ। উদ্ধার কাজে নামে দমকল বাহিনী, রেডক্রিসেন্ট ও স্কাউট সদস্যরা। যোগ দেন সেনাবাহিনীর সদস্যরাও। সমন্বিতভাবে চলে উদ্ধার তৎপরতা। জীবিত উদ্ধারের পাশাপাশি বাড়তে থাকে আহতের সংখ্যা। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয় লাশের মিছিল। স্কুল মাঠে লাশের সারি থেকে স্বজনদের শনাক্ত করতে থাকে শত শত মানুষ। অনেকে ছুটতে থাকেন হাসপাতালে, আহতের তালিকায় যদি পাওয়া প্রিয় মানুষটির নাম।
অথচ ভবনটিতে ফাটল দেখা দেয়ায় এ গার্মেন্টসগুলো চালু থাকারই কথা ছিল না। কিন্তু মুনাফার লোভে পরাজিত হয় মানবিকতা। ভবনমালিক ও গার্মেন্টস মালিক শ্রমিকদের কাজে অংশ নিতে বাধ্য করে। আর ৫টি কারখানার জেনারেটরের কম্পনেই ঘটে দেশের শিল্প ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের। অবহেলাজনিত হত্যার শিকার হন হাজারের বেশি শ্রমিক।
নাম পরিচয়হীন অবস্থায়ও দাফন হতে হয় অনেককে।
বিশ্বব্যাপী আলোড়ন তোলায় যুক্তরাষ্ট্র কর্ম পরিবেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার শর্ত দিয়ে স্থগিত করে জিএসপি সুবিধা। এরপর সরকার, গার্মেন্টস মালিক ও বিদেশি ক্রেতারা নিহতের স্বজনদের ক্ষতিপুরণ, পুনর্বাসন এবং তৈরি পোশাক খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে ঠিকই কিন্তু এর সবই প্রক্রিয়াধীন।
আর যাদের অবহেলা-অদূরদর্শিতায় হলো হাজারো প্রাণহানি সে অপরাধের বিচার হয়নি আজো। তিন বছরেও বিচার শুরু হয়নি তিন মামলার একটিরও। দুর্ঘটনায় হতাহতদের ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসাসেবা এমনকি আইনী সহায়তার প্রতিশ্রুতি ঠিকভাবে পূরণ করা হয়নি এতোদিনেও।
এদিকে, নিহতের স্বজনেরা এখনো প্রতীক্ষার প্রহর গুণেন— যাদের অবহেলা আর দায়িত্বহীনতায় এতগুলো প্রাণ ঝরে গেল তাদের যথাযথ বিচার হবে তো?
তবু থেমে থাকে না জীবন। ভাঙ্গা-গড়ার এ সংসারে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই হতে শত কষ্টেও সুই-সুতোর বুননে নিজেদের জীবন আর দেশের অর্থনীতির চাকা ঠিকই সচল রাখছেন পোশাক শ্রমিকেরা।
সাভারের রানা প্লাজা ধ্বসের ঘটনায় প্রায় বারোশো শ্রমিক নিহত হন। আহত হন দুই হাজারেরও বেশি শ্রমিক। প্রতি বছর নানা দাবি-দাওয়া, আন্দোলন প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে দিনটি পালিত হয়ে আসছে। তবে নিহত শ্রমিকদের অসহায় শিশুদের কথা রয়ে গেছে খবরের অড়ালে। তাদের
রানা প্লাজা ভবন ধসে রাজবাড়ির আলদীপুর গ্রামের সালেহা বেগম তার বড় ছেলে ও ছোট ছেলের বউকে হারিয়েছেন। সেই ক্ষত মুছে যাবার আগেই তাদের রেখে যাওয়া শিশু সন্তানদের নিয়ে চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন এ বৃদ্ধা সালেহা বেগম।
ভবন ধসের ঘটনায় ধামরাইয়ের শিশু বিজয় বাবা-মা দুই জনকেই হারিয়েছে। ক্ষতিপূরণ হিসেবে যে টাকা পেয়েছে, কৌশলে তা হাতিয়ে নিয়েছে স্বজনরা। তাদের নিয়ে বৃদ্ধা দাদীর টানা -পোড়েনের মধ্য দিয়ে জীবন চলছে তার।
দেশ টিভির কাছে এ অভিযোগের কথা বলেন বিজয়ের দাদী রাজিয়া বেগম।
রানা প্লাজা ধসে মা-বাবা হারানো প্রায় ৮০টি শিশুকে নিয়ে কাজ করছে ‘মিনা বাংলাদেশ’ নামে একটি সংস্থা। প্রতি শুক্রবারে তাদের লেখাপড়াসহ বিভিন্ন বিনোদনমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংস্থাটি বলে জানান ফারহানা ফন মিটসলাফ।
এদিকে, শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণে প্রচলিত আইন সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন শ্রমিক নেতারা।
রানা প্লাজা ধ্বসের ৩য় বছর পূর্তিতে রোববার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত মানবন্ধনে তারা এ দাবি জানান।
বাংলদেশ শ্রম আইনে কর্মস্থলে দুঘর্টনায় শ্রমিকরা আহত বা নিহত হলে এর ক্ষতিপূরণ অনেক কম উল্লেখ করে আন্তজার্তিক শ্রম আইন অনুযায়ী আইন প্রণয়ন করার পরামর্শও দেন নেতারা।
রানা প্লাজা ধ্বসে বাবা -মা হারানো শিশুদের ভরণপোষণের দায়িত্ব সরকারকে নেয়ারও আহ্বান জানান তারা।
রানা প্লাজা ধ্বসের ৩য় বছর পূর্তিতে নিহত শ্রমিকদের স্মরণে, আইনগত যথাযথ ক্ষতি পূরণ, আহত শ্রমিকদের চিকিৎসা সেবা ও কর্মস্থলের নিরাপত্তাসহ নানা দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন।