রাজধানীর গুলশানে স্প্যানিশ রেস্তোরাঁ হোলি আর্টিজানে জিম্মি ঘটনায় বিদেশিসহ বেশ কয়েকজনকে শনিবার সকালে ১৩ জনকে মুক্ত করেছে কমান্ডো বাহিনীর সদস্যরা। মুক্ত হওয়ার আগে ও পরের সময়টার বর্ণনা তুলে ধরেন কয়েকজন:
প্রকৌশলী হাসনাত করিম। ১৩ বছর বয়সী সন্তানের জন্মদিন উদযাপন করতে স্প্যানিশ এ ক্যাফেতে গিয়েছিলেন তিনি। তার সঙ্গে ছিল স্ত্রী শারমিন পারভীন এবং ৮ বছর বয়সী আরেকটি সন্তান।
প্রকৌশলী হাসনাত করিমের মা বলেন, রাতভর আটক থাকার পর সকাল ৮টার দিকে কমান্ডো অভিযানে হাসনাতের পরিবার উদ্ধার পায়।
সন্তান, পূত্রবধূ ও নাতনীদের জন্য স্বামী এমআর করিমকে সঙ্গে নিয়ে সারারাত গুলশানর রাস্তায় বসে ছিলাম বলে জানান তিনি।
ছেলেকে ফিরে পাওয়ার পর হাসনাতের মা বলেন, ভেতরে সাত জন বাংলাদেশি একজন ভারতীয়ের পাশাপাশি আরো ২০-২২জন বিদেশি ছিল। আক্রমণকারীরা ছিল ৫জন।
তিনি জানান, জিম্মিকারীরা বাংলাদেশি মুসলমানদের সুরা পড়তে বলে— সুরা পড়তে পারার পর তাদেরকে রাতে খেতেও দেয়া হয়। পারভীন নামে একজন হিজাব পরা থাকায় তাকে সম্মান দেখানো হয়েছে।
ক্যাফেটিতে থাকা বিদেশি কয়েকজনকে রাতেই হত্যা করা হয় বলে হাসনাত তার মাকে জানিয়েছেন।
ভেতরে লাশ আছে জানালেও কয়জন নিহত হন এবং তারা কারা, সে বিষয়ে পুলিশ গণমাধ্যমকে কিছু জানায়নি।
অভিযানে পাঁচ হামলাকারী মারা পড়েন বলে র্যা ব ও পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সকালে ক্যাফে ঘুরে আসার পর এক পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “দেখেছি কয়েকটি লাশ পড়ে আছে। স্থানে স্থানে রক্তের দাগ।”
হলি আর্টিজন বেকারি গুলশান এলাকার বিদেশিদের মধ্যে বেশি জনপ্রিয়। সেখানে লনে অনেকই দেখা যেত চাদর বিছিয়ে রোদ পোহাতে। সবুজ লনে শিশুরাও খেলার পর্যাপ্ত জায়গা পেয়ে ছোটাছুটি করত।
এদিকে, গুলশানের রেস্তোরাঁর ভেতরে আটকে থাকা একজনের সঙ্গে তার ভাইয়ের মুঠোফোনে খুদে বার্তার আদান-প্রদান হয়। জঙ্গিদের হাতে জিম্মি থাকা ওই ব্যক্তির সঙ্গে গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত পৌনে একটা থেকে আজ শনিবার সকাল সোয়া ছয়টা পর্যন্ত যোগাযোগ রাখতে পারেন তার ভাই।
বাইরে উৎকণ্ঠা নিয়ে অপেক্ষমাণ ভাই গোপাল রায় সাংবাদিকদের খুদে বার্তা আদান-প্রদানের তথ্য জানান।
তিতুমীর কলেজের বিএর শিক্ষার্থী গোপাল জানান, হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় কিচেনে বাবুর্চি হিসেবে কাজ করেন তার বড় ভাই সমীর রায়। ভাগনে রিন্টু কীর্তনীয়া (১৬) একই রেস্তোরাঁয় কাজ করে। তারা দুজন একই সঙ্গে ভেতরে একটি টয়লেটে জিম্মি হন। তবে সকালে রিন্টুকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও সমীরের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাচ্ছেন না তারা।
রাত সাড়ে ৯টায় গোপাল প্রথম ফোন দেন সমীরকে। সমীর ফোন ধরেনি। গোপাল দ্বিতীয়বার ফোন দিলেও সমীর তা ধরেননি। রাত ১টা ৪৪ মিনিটে সমীর গোপালের পাঠানো খুদে বার্তার প্রথম জবাব দেন।
গোপাল ও সমীরের আদান-প্রদান করা খুদে বার্তার তথ্য:
গোপাল: কী অবস্থায় আছেন?
সমীর: আমি ও ভাগনে ভালো আছি। ওরা লক করে দিছে দরজা বাইরে থেকে।
গোপাল: র্যা ব সব দেখতেছে, আপনাদের যাতে ক্ষতি না হয়, তাই কিছু করতেছে না।
সমীর: ছোট সুমন জানে আমাদের টয়লেট কোথায়। আমরা সেখানে। পারলে ওয়াল ভাঙ্গো।
গোপাল: ফেসবুক অন করেন। প্লিজ গিভ মি ওয়ান পিকচার।
রাত ২টা ১৫ মিনিটে গোপাল আবার খুদে বার্তা পাঠান।
গোপাল: ওরা কি জানে আপনারা টয়লেটে?
সমীর: হ্যাঁ।
গোপাল: আপনাদের কিছু বলে কি?
সমীর: ঠিক আছি। আমাদের কাছে কিছু চায় না। আমাদের তালা মেরে রেখেছে।
গোপাল: আপনারা টয়লেটে এক সাইড হয়ে বসেন। ওরা ফায়ার করতে পারে।
সমীর: হ্যাঁ, আছি।
ভোর ৪টা ৪৮ মিনিটে গোপাল আবার বার্তা পাঠান সমীরকে।
গোপাল: দাদা, এখন কেমন?
সমীর: এই তো।
ভোর ৫টা ২৮ মিনিটে গোপাল আবারও বার্তা পাঠান।
গোপাল: আমরা সবাই আশীর্বাদ করি সুস্থভাবে আমাদের কাছে ফিরে আসেন।
সমীর: হ্যাঁ, ভাই।
ভোর পাঁচটা ৪৮ মিনিটে সমীর গোপালকে বার্তা পাঠান।
সমীর: এখন হয়তো র্যা ব ঢুকবে। তোমরা তাড়াতাড়ি টয়লেটে আসো। এখানে খুব কষ্টে আছি।
গোপাল: আমি এক মেজরকে বলেছি।
সকাল ৬টা ২২ মিনিটে গোপাল বার্তা পাঠান। ‘প্লিজ বলেন এখন কেমন আছেন?’ তবে সমীর ওই বার্তার কোনো জবাব দেননি।
গোপাল জানিয়েছেন, তাদের বাড়ি বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার জোগাড়পাড় গ্রামে। তারা দুই ভাই, তিন বোন। গোপাল নিজেও গুলশানের ৫০ নম্বর সড়কে একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করেন।
ঘটনাস্থলে দেখা যায় সমীরের দু্ই বোন মিতালি ওঝা ও পুতুল পান্ডে ‘আমার ভাই কোথায়? আমার ভাইকে ফিরিয়ে দাও’ বলে আহাজারি করছেন।
সকালে ভাগনে রিন্টুকে রেস্তোরাঁর ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয়। তবে সমীরের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। রিন্টুও মামার কোনো খোঁজ দিতে পারেননি।
শুক্রবার রাতে একদল বন্দুকধারী রাজধানীর কূটনীতিকপাড়ার হলি আর্টিজেন বেকারিতে ঢুকে হত্যাযজ্ঞ চালায় এতে ২০ জন জিম্মিকে হত্যা করা হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস এই হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছে বলে সাইট ইন্টিলিজেন্স গ্রুপ জানিয়েছে।