রাজধানীর গুলশানে স্প্যানিশ রেস্তোরাঁ হোলি আর্টিজানে জিম্মি ২০ জনকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় স্তম্ভিত সারাদেশ।
এ ঘটনায় রোববার থেকে দেশব্যাপী দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হচ্ছে। অর্ধনমিত রাখা হয়েছে জাতীয় পতাকা।
গতকাল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেন। দেশবাসীর উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণ বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার একযোগে প্রচার করেছে
এ সময় তিনি এ ঘটনায় নিহত শোকবিহ্বল পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান।
প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে দেশের স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যে কোনো মূল্যে সন্ত্রাস নির্মূল করা হবে বলে জানান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের ওপর আস্থা রাখুন— ত্রিশ লাখ শহীদ এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্মানের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। কোনোভাবেই ইসলাম ধর্মকে কুলষিত না করা এবং বিপথগামীদের সঠিক পথে ফিরে আসার কথাও বলেন তিনি।
দুঃসময়ে পাশের থাকায় বিশ্ববাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, মুষ্টিমেয় বিপথগামী সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে—জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সন্ত্রাস-বিরোধী কমিটি, কম্যুনিটি পুলিশ ও সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করে সন্ত্রাস মোকাবেলায় এগিয়ে আসার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।
গতকাল-শনিবার যৌথ বাহিনীর কমান্ডো অভিযান অপারেশন থান্ডারবোল্ট পরিচালনার পর ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয় বলে জানান তিনি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য:
শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার দিকে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি নামের একটি স্প্যানিশ রেস্তোরাঁয় ঘটনার সূত্রপাত হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান ৮ জন অস্ত্রধারী গুলি ও বোমা ফাটিয়ে রেস্তোরাঁটি দখলে নেয়। এসময় তারা ‘আল্লাহু আকবর ধ্বনি উচ্চারণ করে’। রেস্তোরাঁ দখলে নিয়ে তারা আলো নিভিয়ে দেয়।
ওই সময় দোতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে পালিয়ে আসা রেস্তোরাঁর একজন কর্মী সুমন রেজা জানান, হামলাকারীদের কাছে বিভিন্ন অস্ত্র ও তলোয়ার ছিল। রেস্তোরাঁয় ওইসময় প্রায় ৩০ জন দেশি-বিদেশি নাগরিক ছিলেন। তাদের মধ্যে কমপক্ষে ২০ জন বিদেশি।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থল রেস্তোরাঁ ও সংলগ্ন এলাকা ঘিরে ফেলে পুলিশ--পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেয় র্যা ব, বিজিবি, সোয়াত ও কমান্ডো।
ঘটনাস্থল থেকে গুলশানের প্রায় ৪ বর্গ কিলোমিটার এলাকা ঘিরে রাখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পুরো এলাকায় প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। বন্ধ করা হয় যান চলাচল। ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ, র্যা ব ফায়ার সার্ভিস, সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর কমান্ডোদল ও বিভিন্ন বিশেষায়িত ইউনিট।
বিশেষায়িত ইউনিটের সদস্যরা গ্রেনেড শিল্ড, বুলেট শিল্ড, দরজা ভাঙার যন্ত্রপাতি ও ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অবস্থান নেয়।
জিম্মিদের উদ্ধার অভিযানে শনিবার সকাল পৌঁনে ৮টা শুরু করে সেনাবাহিনীর প্যারাকমান্ডো বাহিনী। জঙ্গিদের সঙ্গে চলে প্রায় দু'ঘণ্টাব্যাপী গুলি বিনিময়। থেমে থেমেই চলে গুলি আর গ্রেনেডের শব্দ। প্যারাকমান্ডোদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান অংশ নেয় অভিযানে।
এদিকে, উদ্ধার অভিযানের আগেই শুক্রবার রাতে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-ওসি সালাউদ্দিন আহমেদ ও ডিবির এসি রবিউল ইসলাম নিহত হন।
শনিবার ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে ওই রেস্তোরাঁর কাছাকাছি অবস্থান নেয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এর আগে বিভিন্ন বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা কয়েক ঘণ্টা ধরে সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে করণীয় নিয়ে বৈঠক করেন।
ভোর ৫টার দিকে ওই কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ফিরে এলে মাইকিং করে সাধারণ পোশাকের সবাইকে সরিয়ে দেয়। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের যারা সাদা পোশাকে ছিলেন তাদেরকে বাহিনীর ভেস্ট পরার নির্দেশ দেয়া হয়। মিডিয়া কর্মীদেরও দূরে সরিয়ে নেয়া হয়।
সকালে অভিযানের একপর্যায়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন পুলিশের মহাপরিদর্শক ও রযা্ বের মহাপরিচালক। যদিও অভিযান সম্পর্কে গণমাধ্যমকে কিছুই অবহিত করেননি তারা।
দুঃস্বপ্নের রুদ্ধশ্বাস সময় শেষে স্বস্তি মিলে জিম্মি হওয়া মানুষ, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, গণমাধ্যমকর্মী ও উৎকন্ঠিত দেশবাসীর।
শনিবার আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর):
রাজধানীর গুলশান ২ এ রোড নম্বর ৭৯, স্প্যানিশ রেস্তোরাঁ হোলি আর্টিজানে গুলি ছুড়তে ছুড়তে দুস্কৃতিকারীরা প্রবেশ করে এবং সবাইকে জিম্মি করে। ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ সেখানে পৌঁছায় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা করে। তাদের অভিযানকালে দুজন সাহসী পুলিশ অফিসার নিহত হন এবং ২০ জনের অধিক পুলিশ অফিসার আহত হয়েছেন। উদ্ভুত এ পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীকে অভিযান পরিচালনা করার জন্য সরকার প্রধান থেকে আদেশ প্রদান করা হয়।
সেই আদেশ মোতাবেক বাংলাদেশ সেনাবাহিনী অপারেশন থান্ডারবোল্ট পরিচারনা করার পরিকল্পনা করে। গতকাল রাত থেকেই সেনাবাহিনী তথ্য সংগ্রহ করে। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও র্যা ব, ফায়ার সার্ভিস ও গোয়েন্দা বাহিনী সদস্য মিলে যৌথভাবে অপারেশন থান্ডারবোল্ট পরিচালনা করে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কামান্ডো অভিযানের মাধ্যমে ৭.৪০ মিনিটে অপারেশন শুরু হয় এবং ১২ থেকে ১৩ মিনিটের মধ্যে সব সন্ত্রাসীকে নির্মূল করে টার্গেট এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেয়।
পরবর্তীতে অপারেশনে সকল কার্যক্রম শেষ করে সকাল সাড়ে ৮টায় অপারেশন সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। অপারেশনের মাধ্যমে ৩ জন বিদেশি তারমধ্যে একজন জাপানি এবং ২ জন শ্রীলঙ্কান নাগরিকসহ ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয় যৌথ বাহিনী। অভিযানে ৭ জন সন্ত্রাসীর মাধ্যমে ৬ জন নিহত এবং একজন সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০ জনকে গতকাল শুক্রবার রাতেই হত্যা করা হয়েছে। এছাড়া শুক্রবার রাতে পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম ও বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালাউদ্দিন সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন।
ভোর সাড়ে ৭টা ৪০ মিনিটে পুলিশের বিশেষায়িত বাহিনী সোয়াত, নৌবাহিনীর কমান্ডো দল, সেনাবাহিনী ও প্যারা কমান্ডোসহ পুলিশ, র্যা পিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যা ব) ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সম্মিলিতভাবে এ অভিযান শুরু করে।
এছাড়াও অভিযানকালে ২০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাদের প্রত্যেককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে রাতেই হত্যা করা হয়েছে।
সামরিক অপারেশন অধিদপ্তরের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাঈম আশফাক চৌধুরী সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন।
অভিযানে অংশ নেয়া কোনো সদস্যই হতাহত হয়নি বলে নিশ্চিত করেছেন তিনি।
নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী বিজিবি, পুলিশ ও র্যা ব, ফায়ার সার্ভিস ও গোয়েন্দা বাহিনী পরিচানায় ধন্যবাদ জানানো হয় সংবাদ সম্মেলন থেকে।