বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের প্রতি বুধবার শ্রদ্ধা নিবেদন নিবেদন করা হয়েছে। এর আগে তেজগাঁওয়ে চ্যা নেল আই কার্যালয়ে জানাজা দেয়া হয়।
সকালে এ লেখকের কফিন ইউনাইটেড হাসপাতালের হিমঘর থেকে তেজগাঁওয়ে চ্যানেল আই কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রতিনিধিরা সেখানে জানাজায় অংশ নেন।
তেজগাঁও থেকে শামসুল হকের মরদেহ বেলা পৌনে ১১টার দিকে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে পৌঁছায়। তার কফিন রাখা হয় নজরুল মঞ্চে। বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানসহ একাডেমির কর্মকর্তা-কর্মচারি এবং শিল্প-সাংস্কৃতিক অঙ্গণের প্রতিনিধিরা সেখানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
বাংলা একাডেমি থেকে কফিন নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, সেখানে সর্বস্তরের মানুষ শেষবারের মত বিদায় জানাচ্ছেন বাংলা সাহিত্যের সব ক্ষেত্রে সদর্পে বিচরণকারী এ লেখককে।
ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মঙ্গলবার রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ সব্যসাচী লেখক ও কবি মারা যান।
রাতে গুলশান ৬ নম্বর রোডে তার বাড়ি ‘মঞ্জুবাড়িতে’ শেষ গোসলের পর কফিন রাখা হয় ইউনাইটেড হাসপাতালের হিমঘরে।
জোহরের নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যারলয় কেন্দ্রীয় মসজিদে জানাজা শেষে বিকেলে সৈয়দ শামসুল হকের মরদেহ হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়া হয় তার গ্রামের বাড়ি কুড়িগ্রামে। পরে জানাজা শেষে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের প্রধান ফটকের দক্ষিণ দিকে সবুজ ধানখেতের পাশে কবিকে সমাহিত করা হয়।
১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর এই কুড়িগ্রাম শহরের থানা পাড়ায় তার জন্ম। শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজ প্রাঙ্গণে তার কবর হয়।
সৈয়দ হকের বয়স হয়েছিল ৮১ বছর। তিনি স্ত্রী আনোয়ারা সৈয়দ হক এবং এক ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। ১৯৫৩ সালে ‘একদা এক রাজ্যে’ কাব্য দিয়ে তার যাত্রা শুরু হলেও ‘তাস’ নামক গ্রন্থ আগেই প্রকাশিত হয়েছিল।
তারপর অবিরাম লিখেছেন সৈয়দ হক। সাহিত্যের সব শাখায়। তবে সব ছাপিয়ে কবি পরিচয়টিই প্রধান মনে করতেন তার সাহিত্যা ঙ্গনের বন্ধুরা।
তারা রচিত:
বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা, পরাণের গহীন ভেতর, নাভিমূলে ভস্মাধার, আমার শহর ঢাকা, বেজান শহরের জন্য কেরাম, বৃষ্টি ও জলের কবিতা- এসব কাব্যিগ্রন্থের অজস্র কবিতায় তার নানা নীরিক্ষা জনপ্রিয়তাও এনে দেয় তাকে।
কাব্যনাট্য রচনায় ঈর্ষণীয় সফলতা পাওয়া সৈয়দ হক নূরলদীনের সারাজীবন, পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়, গণনায়ক, ঈর্ষা ইত্যাদি নাটকে রেখেছেন মুন্সীয়ানার স্বাক্ষর। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ ও ‘নুরলদীনের সারাজীবন’ বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে।
সৈয়দ হক মহাকাব্যিক পটভূমিকায় বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ নামে দীর্ঘ উপন্যাস যেমন লিখেছেন, তেমনি ছোট আকারের উপন্যাস লিখেছেন সমান তালে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে তাৎপর্যময় হয়ে উঠেছে তার ‘নিষিদ্ধ লোবান’সহ নানা উপন্যাটসে।
‘খেলারাম খেলে যা’, ‘নীল দংশন’, ‘মৃগয়া’, ‘সীমানা ছাড়িয়ে’, ‘এক মহিলার ছবি’, ‘দেয়ালের দেশ’, ‘স্তব্দতার অনুবাদ’, ‘এক যুবকের ছায়াপথ’, ‘মহাশূন্যে পরানমাস্টার’, ‘তুমি সেই তরবারী’, ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’, ‘অন্তর্গত’, ‘এক মুঠো জন্মভূমি’, ‘শঙ্খলাগা যুবতী ও চাঁদ’, ‘বাস্তবতার দাঁত ও করাত’, ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’
‘আয়না বিবির পালা’সহ ৫০টির বেশি উপন্যাহস এসেছে তার হাত দিয়ে।
ছোটগল্পে তিনি নিজের এলাকা উত্তরাঞ্চলের হতদরিদ্র মানুষের জীবনের মর্মন্তুদ ছবি একেছেন।
গত শতকের ষাট, সত্তর ও আশির দশকে অনেক চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যেুর সঙ্গে চলচ্চিত্রের জন্য গানও লিখেছেন সৈয়দ হক। তার লেখা গান ‘হায়রে মানুষ রঙিন ফানুস’, ‘তোরা দেখ দেখ দেখরে চাহিয়া’, ‘চাঁদের সাথে আমি দেব না তোমার তুলনা’র মতো বহু গান এখন মানুষের মুখে ফেরে।
তার নিষিদ্ধ লোবান উপন্যা্স নিয়ে কয়েক বছর আগে গেরিলা নামে চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়।
সংবাদপত্রে কলাম লেখাকে আকর্ষণীয় করে তোলার ক্ষেত্রে অনেকেই সৈয়দ হকের দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত ‘হৃৎকলমের টানে’র কথা বলেন।
সৈয়দ হকের আত্মজীবনী ‘প্রণীত জীবন’ও প্রশংসিত হয়েছে সাহিত্যা ঙ্গনের মানুষদের কাছে।