রংপুরের গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে চিনিকলের জায়গা কখনোই সাঁওতালদের ছিল না—তাদের ব্যবহারকারী ভূমিদুস্যূ বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানিয়েছেন শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকের এ কথা বলেন তিনি।
জঙ্গি কর্মকাণ্ডে ব্যর্থ হয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা করা হয়েছিল ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে— স্বার্থান্বেষী মহলের সে চেষ্টা সরকার ব্যর্থ করে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা যাতে ঘটাতে না পারে সেবিষয়েও সতর্ক নজরদারি রয়েছে বলে জানিয়েছেন সরকারের আইন শৃংখলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভাপতি আমু।
সংবাদ সম্মেলনে সরকারি জমি দখলের জন্য ভূমিদস্যুরা গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতালদের ব্যবহার করেছে বলে জানান তিনি।
প্রায় তিনমাস পর মঙ্গলবার সকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৈঠকে বসে আইন শৃংখলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর সভাপতিত্বে বৈঠকে সম্প্রতি ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও সহিংসতার বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পায়।
শেষে সংবাদ সম্মেলনে আমু বৈঠকের বিস্তারিত তুলে ধরে বলেন, জঙ্গি তৎপরতায় ব্যর্থ হয়েই ব্রাক্ষ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে মন্দির ও হিন্দুদের বাড়ি-ঘরে হামলা চালানো হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, যে জমিকে কেন্দ্র করে ওই ঘটনা ঘটেছে সেই জমি ১৯৫৪ সালে সরকার কিনে চিনি কল নির্মাণের উদ্দেশ্যে। তখন সেখানে কোনো বসতি ছিল না। ওই জমি দখলের জন্য কিছু ভূমিদস্যু সাঁওতালদের ব্যবহার করে তাৎক্ষণিক বসতি স্থাপন করে। সরকার ওই জমি দখলে না নিলেও ভূমিদস্যুরা তাদের উচ্ছেদ করে দিত।
তিনি বলেন, নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জ এবং রায়পুরের ঘটনা একেবারেই বিচ্ছিন্ন। এর সঙ্গে দেশের আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির কোনো সম্পর্ক নেই। বর্তমানে আইন-শৃংখলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল জানিয়ে তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটতে পারে সে জন্য অপরাধীদের আইনের আওতায় নিয়ে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
এ সময় মন্ত্রী বলেন, ১৯৫৪ সাল থেকে রংপুরের গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে সাহেবগঞ্জের আখ খামারের জমির মালিক চিনিকল কর্তৃপক্ষ।
গতকাল শিল্প সচিব সচিব মোশাররফ হোসেন ভূইয়া সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন, গোবিন্দগঞ্জে সাঁওতাল পল্লীতে কোনো হামলা হয়নি উল্টো তারাই পুলিশ এবং চিনিকলের শ্রমিকদের ওপর হামলা করেছে।
সোমবার সকালে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
চিনিকলে জমি দখল ও দখলমুক্ত করার সরকারি চেষ্টার ফলে যে ঘটনা ঘটেছে এর পেছনে একটি স্বার্থান্বেষী মহল জড়িত রয়েছে বলে জানান তিনি।
এর পেছনে ইন্দনদাতা প্রভাবশালী মহলকেও চিহ্নিত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
শিল্প সচিব দাবি করেন, একটি প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে গত কয়েক মাসে চিনিকলের জমিতে সাঁওতালরা প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ অস্থায়ী বাড়িঘর তৈরি করে। এগুলো দখলমুক্ত করতে গেলে সাঁওতালরাই পুলিশের ওপর হামলা করে। সাঁওতালদের ইন্ধনদানকারীদেরকেও চিহ্নিত করেছে গোয়েন্দা সংস্থা।
সংবাদ সম্মেলনে শিল্প সচিব সচিব আরো বলেন, চিনি কলের জায়গার ওপর সাঁওতালরা অবৈধভাবে অস্থায়ী বসতি স্থাপন করেছিল। পুলিশ প্রশাসন তা দখলমুক্ত করেছে আর সেখানে কোনো নিরাপত্তাহীনতা নেই বলেও দাবি তার।
রংপুর চিনিকল প্রতিষ্ঠার সময় ১৯৫৪-৫৫ সালে গাইবান্ধার সাহেবগঞ্জে সাঁওতাল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ১ হাজার ৮৪২ একর জমি অধিগ্রহণ করেছিল তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। শর্ত ছিল কখনো যদি চিনিকল বন্ধ ঘোষণা করা হয় তাহলে সাঁওতালদের আবারো এ জমি ফেরত দেয়া হবে। কিন্তু ক্রমাগত লোকসানের কারণে সাম্প্রতিক সময়ে চিনিকল বন্ধের গুজব রটে। চিনিকল কর্তৃপক্ষ কিছু জমি্ ইজারাও দেয়। এমন পরিস্থিতিতে সাঁওতালরা জমির উত্তরাধিকার দাবি করলে তাদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে প্রশাসনের।
শিল্প সচিবের দাবি, সেখানে বর্তমানে কোনো নিরাপত্তা সংকট নেই। সাঁওতালরা নিজেরাই সহানূভীতি আদায়ের জন্য থমথমে পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছে।
তার দাবি, সেখানে সাঁওতালদের উপর কোনো নির্যাতন হয়নি। সাঁওতালরা এই জমির মালিক কখনোই ছিলেন না। পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সংঘর্ষে কারও মৃত্যু হয়নি বলেও দাবি শিল্পমন্ত্রণালয়ের।
শিল্পসচিব বলেন, আহত ব্যক্তিদের জন্য ক্ষতিপূরণ ও ত্রাণ সহায়তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। প্রয়োজনে ওই এলাকার ভূমিহীন সাঁওতালদের সরকারি উদ্যোগে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে কিন্তু চিনিকলের জমিতে কোনো অবৈধ দখলদার থাকতে পারবে না।
গত ৬ নভেম্বর রংপুর চিনি কলের সাহেবগঞ্জ আখের খামারের স্থাপনা উচ্ছেদের সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় তাদের। এতে ওই দিন একজন মারা যান। পরে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় ধানখেত থেকে। সাঁওতালদের অভিযোগ, শেষের জন ওই হামলায় আহত হয়ে মারা গেছেন।
আহত হন পুলিশসহ কমপক্ষে ৩০ জন। এছাড়া সাঁওতালদের বাড়ি-ঘরেও আগুন দেয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে শিল্প মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, চিনি ও খাদ্যশিল্প সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
হামলায় আওয়ামী লীগের স্থানীয় সাংসদ ও সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যানের ইন্ধন রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সাঁওতাল নেতারা। গতকাল রোববার বিকেলে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাপমারা ইউনিয়নের মাদারপুর গির্জার সামনে এক সমাবেশে তারা এ অভিযোগ করেন। সমাবেশে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা এবং জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, জাতীয় আদিবাসী ফোরাম ও বিশিষ্ট নাগরিকদের দুটি প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিল।