আজ ১৪ ডিসেম্বর, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। মহান মুক্তিযুদ্ধের এদিনে বাংলাদেশ যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে তখনই পাকিস্তানি হানাদার হায়েনার দল তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার-আলবদরদের সঙ্গে নিয়ে চালায় শতাব্দীর বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ।
পরিকল্পিতভাবে বেছে বেছে হত্যা করা হয় জাতির মেধা-মননের কাণ্ডারী শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীদের। রক্ষা পাননি কবি-লেখক-সাহিত্যিক, সাংবাদিক-গবেষক, চিকিৎসক, সমাজকর্মী কেউই। শুধু ঢাকা নয় একাত্তরে সারাদেশেই নির্মম হত্যার শিকার হন জাতির সূর্যসন্তানরা। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ৪৫ বছরেও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে করা হয়নি শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নামের পূর্ণাঙ্গ তালিকা; জানানো হয়নি রাষ্ট্রীয় সম্মান। এ নিয়ে আক্ষেপ-বেদনায় তাড়িত শহীদদের স্বজনেরা।
মুক্তির সংগ্রামের এক মরণপণ যুদ্ধে তখন পুরো জাতি, বাঙালি আর দাবিয়ে রাখার নয়, এ দেশ-মাটি শত্রুমুক্ত হবেই।
হত্যা-ধ্বংস-গণহত্যা চালিয়েই পাকিস্তানি হানাদাররা মনে করেছিল সব কিছু স্তব্ধ করা যাবে। কিন্তু যখন নিশ্চিত হয়ে উঠলো তাদের পরাজয় স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় যখন অবশ্যম্ভাবী -- হানাদাররা তখন তাদের এ দেশীয় দোসরদের নিয়ে শুরু করে আরেক বর্বরতা, গণহত্যার নজিরবিহীন এক বীভৎসতা। পাকিস্তানিদের দোসর হয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়েই এই নিধনযজ্ঞে শামিল হয় জামাত। রাজাকার, আল বদর, আল শামস নামে ঘাতকবাহিনী গঠিত হয় জামাত ও তার ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের দিয়েই।
উদ্দেশ্য ছিল একটাই আত্মপ্রকাশের শুরুতেই যেন বাংলাদেশ ভেঙে পড়ে আর কখনোই যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারে এই দেশ, এ মাটির মানুষ। হানাদারদের নিয়ে দেশময় ছুটে বেড়ায় রাজাকার-আলবদর-আলশামস বাহিনীর ঘাতকরা। বেছে বেছে হত্যা করা হয় জাতির মেধা-মননের কাণ্ডারীদের। পাকিস্তানি জেনারেল রাও ফরমান আলী ছক কাটেন কিলিং মিশনের আর নেতৃত্ব দেন জামাত-ছাত্রসংঘ, অপারেশন চালায় গোলাম আযম-নিজামী-মুজাহিদদের ঘাতকদল।
বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের হত্যার এমন বর্বরতার নজির পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া দুস্কর। এক-একজনকে চোখ বেঁধে নিয়ে গিয়ে বেয়নেটে খুঁচিয়ে, চোখ তুলে নিয়ে, জবাই করে বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে হত্যা করে তারা। নৃশংসতার আর কোনো উদাহরণই বাকি রাখেনি খুনিরা। মুনীর চৌধুরী, শহীদুল্লাহ কায়সার, সিরাজউদ্দীন হোসেন, আনোয়ার পাশা, ডা. ফজলে রাব্বি, ডা. আলীম চৌধুরী, আলতাফ মাহমুদ, সেলিনা পারভীনসহ যে উজ্জ্বল মেধাবী মানুষগুলো স্বাধীন এ দেশের শিক্ষা-মনন-সংস্কৃতির কাঠামো গড়ে দিতে পারতেন বেছে বেছে হত্যা করা হয় সবাইকে।
শুধু ঢাকায় নয়, রাজাকার-আলবদরদের এ বর্বর হত্যাযজ্ঞ চলেছে সারা দেশেই। সাইদুর রহমান তেমনই এক শহীদ পরিবারের সন্তান। একাত্তরে সৈয়দপুরে হারিয়েছেন বাবা-মা, ভাইসহ পরিবারের পাঁচজনকে। তার চোখের সামনেই ঘটে নির্মম হত্যাযজ্ঞ।
এমন অনেকে শহীদ হয়েছেন যারা ছিলেন তাদের পরিবারের বাতিঘর। শহীদ পরিবারে নেমে আসা অমাবস্যা কি কেটেছে মুক্তিযুদ্ধের ৪৫ বছরেও?
এতো বছরেও শহীদদের নামের পূর্ণাঙ্গ তালিকা না হওয়ায় বেদনাতাড়িত হয়ে ফিরছেন শহীদ ডা. আলীম চৌধুরীর মেয়ে ডা. নুজহাত ও শহীদ সাংবাদিক সেলিনা পারভীনের ছেলে সাইদুর রহমান, সুমন জাহিদ।
শহীদ পরিবারের অনেকের দাবি বুদ্ধিজীবীদের যথার্থ মূল্যায়ন, রাষ্ট্রীয় সম্মাননা। আর ৩০ লাখ শহীদের জন্য আলাদা একটি দিবস ঘোষণা করে দেশব্যাপী তা পালন করার।