কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে ব্যস্ততা থেকে কিছুটা অবসর নিতেই হিমালয়ের দেশে যাত্রা করেছিলেন বেশিরভাগ বাংলাদেশিরা। পরিবার পরিজনের কাছ থেকে নেয়া ক'দিনের ছুটি শেষ বিদায়ে পরিণত হলো বিএস ২১১ ফ্লাইটে নিহত যাত্রীদের।
কাঠমান্ডুর দুর্ঘটনায় শেষ হয়ে গেছে কারও গোটা সংসার, কেউ হারিয়েছেন মেডিক্যাল পড়ুয়া ছেলে; আবার স্বামী-সন্তান হারিয়ে ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন কোন স্ত্রী। আর তাই নিজেদের সান্তনা দেওয়ার ভাষাটাও খুঁজে পাচ্ছেন না স্বজনরা। মৃত্যুর আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া শেষ স্ট্যাটাস আর সেলফিতে আপনজনকে খুঁজে ফিরছেন স্বজনরা।
একদিন আগের হাসিমাখা ছবি এখন শুধুই স্মৃতি। ছবি তুলে যাত্রা আর তার কিছু সময় পরই কাঠমান্ডুতে ভয়াবহ বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ফারুক আহম্মেদ ও তার মেয়ে প্রেয়সী।
শ্রীপুরের নগর হাওলা গ্রামের বাড়িতেই শিশুকণ্যা প্রেয়সীকে নিয়ে থাকতেন ফারুক, এ্যানী দম্পতি। পেশায় ফটোগ্রাফার ফারুক পছন্দ করতেন ছবি তোলা ও দেশবিদেশ ভ্রমণ। সোমবারও স্ত্রী এ্যানী, মামাতো ভাই মেহেদী ও তার স্ত্রী কামরুন নাহার স্বর্ণাকে নিয়ে বেরিয়েছিলেন ভ্রমণের উদ্দেশ্যে।
সোমবার দুপুর ১২ টার দিকে ফারুক আহম্মেদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের সর্বশেষ কথা হয়। এরপরই জানা যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনার কথা। মারা যান ফারুক আহম্মেদ ও তার শিশুসন্তান তামরার প্রেয়সী। ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছেন ফারুকের স্ত্রী এ্যানী, মেহেদী ও স্বর্ণা।
কাঠমান্ডুর বিমান দুর্ঘটনায় আটবছরের সন্তানসহ হারিয়ে গেছে রফিক-বিপাশা দম্পতির পরিবার। বিপাশা একটি বেসরকারি সংস্থায় জনসংযোগ শাখার দায়িত্ব পালন করতেন। একসময় সাংবাদিকতায় যুক্ত ছিলেন রফিক জামান। মৃত্যুর আগে তিনি প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে কাজ করতেন। তাদের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ বিপাশার গ্রামের বাড়ি যশোরের উপশহর এলাকা।
দুই সরকারি কর্মকর্তা উম্মে সালমা ও নাজিয়া আফরিন চৌধুরী একটি কর্মশালায় অংশ নিতে যাচ্ছিলেন কাঠমান্ডুতে। দুর্ঘটনায় তারা দুজনই নিহত হয়েছেন।
ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিলে আছেন বৈশাখী টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার ফয়সাল আহম্মেদ। দুর্ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তির কয়েক ঘন্টার মধ্যেই মারা যান তিনি। শরীয়তপুরের দক্ষিণ ডামুড্যা গ্রামে তার বাড়িতে এখন কান্নার রোল।
খুলনার আলিফুজ্জামান আলিফের শেষ সেলফি ছিলো এটি। এমএম সিটি কলেজের শিক্ষার্থী আলিফও ভ্রমণের উদ্দেশ্যেই নেপালে যাত্রা করেছিলেন।
ইউএস বাংলার সেই ফ্লাইটে ছিলেন মানিকগঞ্জের শশী-শাওন দম্পতি। বিবাহ বার্ষিকী পালন করতে যাচ্ছিলেন এভারেস্টের দেশে। দুর্ঘটনায় শশী নিহত হলেও বেঁচে আছেন ডা. রেজওয়ানুল হক শাওন।
ফেইসবুকে পাঁচদিনের জন্য দেশকে বিদায় দিয়েছিলেন গোপালগঞ্জ শেখ সাবেরা খাতুন মেডিক্যাল কলেজের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী, বরিশালের পিয়াস রায়। বিমান দুর্ঘটনায় পিয়াসও এখন অজানা দেশের বাসিন্দা।
একই ফ্লাইটে ছিলেন রুয়েট শিক্ষিকা ইমরানা কবির হাসি ও স্বামী রকিবুল। হাসি কাঠমান্ডু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউ এবং তার স্বামী একই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।
এদিকে, সিলেটের রাগিব রাবেয়া মেডিক্যাল কলেজের ১৩ নেপালী শিক্ষার্থীর মধ্যে ১১ জনই ওই দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। তাদের স্মরণে কলেজে তিনদিনের শোক পালন করা হচ্ছে।
কাঠমান্ডুতে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন সেই বিমানের পাইলট, ক্রুসহ আরো কয়েকজন বাংলাদেশি। আহতরা হাসপাতালে ভর্তি আছেন। হতাহতদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা চান স্বজনরা।