কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে রাখা স্বর্ণের অনিয়মের অভিযোগ পুরোপুরি সত্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান।
বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় সচিবালয়ে এ বিষয়ে বৈঠকে করেছেন অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির।
এছাড়া বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর এবং শুল্ক ও গোয়েন্দা অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন মন্ত্রী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রাখা স্বর্ণের হেরফেরের কথা বলা হয়েছে— তা সঠিক নয় এ দাবি করে অর্থপ্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, আমলাতান্ত্রিক গাফিলতির কারণে শুধু তথ্যের কিছু হেরফের হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে জমা রাখা হয়েছিল স্বর্ণের চাকতি তা হয়ে গেছে সঙ্কর বা মিশ্র ধাতু। রাখা হয়েছিল ২২ ক্যারেটের হয়ে গেছে ১৮ ক্যারেট। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রাখা ৯৬৩ কেজি স্বণের মধ্যে থেকে দৈবচয়ন ভিত্তিতে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে এমন গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়েছে শুল্ক ও গোয়েন্দা অধিদপ্তরের তদন্তে।
বুধবার বিষয়টি নিয়ে শুল্ক ও গোয়েন্দা অধিদপ্তরের সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থপ্রতিমন্ত্রী।
বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকে রাখা স্বর্ণ স্বর্ণই আছে। কিছু করণিক ভুল ও তথ্যের গরমিলের কারণে এ হেরফেরের কথা উঠে এসেছে।
কিন্তু দীর্ঘ এক বছর ধরে বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে শুল্ক ও গোয়েন্দা অধিদপ্তর এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে একাধিকবার চিঠি চালাচালিও করেছে তারা।
তখন কেন এ তথ্যের গরমিলের বিষয়টি ধরা পড়লো না? বিষয়টি নিয়ে প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে এ বিষয়ে আরো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার কথা জানান তিনি।
বিষয়টি নিয়ে কাউকে আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিদেশে অবস্থান করায় প্রতিমন্ত্রী এ বৈঠক করেন।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত স্বর্ণ হেরফের হওয়ার কোনো সুযোগ নেই জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মো. রবিউল হুসাইন।
বিকেলে বাংলাদেশ ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত স্বর্ণ হেরফের হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এটা শুল্ক গোয়েন্দার নিজস্ব রিপোর্ট— এই রিপোর্টের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো সর্ম্পক নাই।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মেশিনের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের মেশিনের মাপের পার্থক্য হয়—এই মেশিন নিয়ে সন্দেহ আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, যেসব স্বর্ণ নিয়ে অভিযোগ তোলা হয়েছে তা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে যাচাই করার আবেদন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে একটি জাতীয় দৈনিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট থেকে স্বর্ণ চুরির বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরই প্রেক্ষিতে বিকেলে এ সংবাদ সম্মেলন করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের এক অনুসন্ধান প্রতিবেদনে এ ভয়ংকর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। দৈবচয়ন ভিত্তিতে নির্বাচন করা বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রক্ষিত ৯৬৩ কেজি সোনা পরীক্ষা করে বেশির ভাগের ক্ষেত্রে এ অনিয়ম ধরা পড়ে। প্রতিবেদনটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড হয়ে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে দেয়া হয়েছে।
২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করে শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তর।
গত জানুয়ারিতে কমিটি শুল্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর প্রতিবেদন জমা দেয়। গত ২৫ জানুয়ারি প্রতিবেদনটি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো হয়। পরিদর্শন দল ভল্টে রাখা সোনার যাচাই-বাছাই শেষে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছে। তার মধ্যে প্রথম পর্যবেক্ষণ ছিল একটি সোনার চাকতি ও আংটি নিয়ে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৫ সালের ২৩ আগস্ট কাস্টম হাউসের গুদাম কর্মকর্তা হারুনুর রশিদ গোলাকার কালো প্রলেপযুক্ত একটি সোনার চাকতি এবং একটি কালো প্রলেপযুক্ত সোনার রিং বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক ওই চাকতি এবং আংটি যথাযথ ব্যক্তি দিয়ে পরীক্ষা করে ৮০ শতাংশ (১৯ দশমিক ২ ক্যারেট) বিশুদ্ধ সোনা হিসেবে গ্রহণ করে প্রত্যয়নপত্র দেয়। কিন্তু দুই বছর পর পরিদর্শন দল ওই চাকতি ও আংটি পরীক্ষা করে তাতে ৪৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ (১১ দশমিক ২ ক্যারেট) সোনা পায়। আংটিতে পায় ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ সোনা (৩ দশমিক ৬৩ ক্যারেট)। ধারণা করা হচ্ছে ভল্টে রাখার পর এগুলো পাল্টে ফেলা হয়েছে। প্রতিবেদন বলছে, ভল্টে থাকা সোনার চাকতি এবং আংটি পরীক্ষার পর দেখা যায় এগুলো সোনার নয়, অন্য ধাতুর মিশ্রনে তৈরি। এতে সরকারের ১ কোটি ১১ লাখ ৮৭ হাজার ৮৬ টাকা ৫০ পয়সা ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরিদর্শন দল প্রতিটি রসিদের অনুকূলে জমা হওয়া সোনা যাচাই করেছে। তাতে দেখা গেছে, সোনার অলংকার এবং সোনার বারে ক্যারেটের তারতম্য করা হয়েছে। ২৪ থেকে ২০ ক্যারেটের ৯৬০ কেজি সোনার বেশির ভাগের ক্ষেত্রে ভল্টে ১৮ ক্যারেট হিসেবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। কম ক্যারেটে নথিভুক্ত থাকায় নিলাম বা অন্য উপায়ে বিক্রির সময় অতিরিক্ত ক্যারেটের বিপরীতে প্রাপ্য টাকা থেকে সরকার বঞ্চিত হবে। সোনার ক্যারেটের তারতম্য ঘটানোর কারণে সরকারের ১ কোটি ৯০ লাখ ৮৫ হাজার ৩৪৬ টাকা ৬৭ পয়সা ক্ষতির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
ক্যারেটের তারতম্য হলে সোনার দামের কী পার্থক্য হয় সে বিষয়ে বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) নির্বাহী কমিটির সদস্য দেওয়ান আমিনুল ইসলাম জানান, ক্যারেটের মাধ্যমে সোনার মান নির্ধারিত হয়। আর মান অনুসারে সোনার দাম কমবেশি হয়। ২২ ক্যারেট বা ২১ ক্যারেটের সোনা এবং ১৮ ক্যারেটের সোনার দামে বড় অঙ্কের পার্থক্য আছে।
শুল্ক গোয়েন্দা, কাস্টমসহ বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে আটক সোনা নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা করা হয়। কাস্টম হাউসের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকে যখন সোনা জমা রাখা হয়, তখন ব্যাংকের পক্ষ থেকে স্বর্ণকার দিয়ে পরীক্ষা করে সোনার মান নির্ধারণ করা হয়। ব্যাংক, এনবিআর এবং সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে ওই সব সোনা মান নির্ধারণপূর্বক ব্যাংক গ্রহণ করে রসিদ দেয় সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে এ-সম্পর্কিত প্রতিবেদন পাঠিয়ে দেওয়া হয়।