জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর তথ্য অনুযায়ী পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গত বছর ৬৫ হাজার ৪৯৫ বাংলাদেশি রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে এক বছরে ২২ হাজার ৬৭২ বাংলাদেশি শরণার্থী হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। এর আগে ২০২০ সালে দেশে দেশে আশ্রয়প্রার্থী বাংলাদেশি ছিলেন ৬৪ হাজার ৬৩৬ জন, ২০১৯ সালে ৬২ হাজার ৮৬০ জন এবং ২০১৮ সালে ৬২ হাজার ৮৬০ জন।
রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী ও শরণার্থী হিসেবে বিদেশে চলে যাওয়া ব্যক্তিদের বেশির ভাগই অর্থনৈতিক কারণে দেশ ছেড়েছেন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। করোনা মহামারিতে দেশে আয়ের সুযোগ কমে যাওয়া ও বৈধ পথে বিদেশ যাওয়া সংকুচিত হওয়ায় এ প্রবণতা বাড়ছে বলে তাঁদের মত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাজে একশ্রেণির তরুণদের ভেতরে যেকোনো পন্থায় বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা তীব্র হয়েছে। আর এ সুযোগটিই নিচ্ছে মানব পাচারকারী চক্র। ভূমধ্যসাগর এবং লিবিয়া, তিউনিসিয়া ও ইতালির উপকূল থেকে মিলছে অনেক বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর। পাচারের বিভিন্ন রুট থেকে প্রতিনিয়তই উদ্ধার করা হচ্ছে বাংলাদেশি নাগরিকদের। উদ্ধার হওয়া এসব অভিবাসনপ্রত্যাশীদের বেশির ভাগকেই আইওএম-এর সহযোগিতায় ফিরিয়ে আনা হচ্ছে দেশে।
ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ১৮ হাজার ৯৪৮ জন, ২০১৯ সালে ২২ হাজার ৭৬৬ জন, ২০১৮ সালে ২১ হাজার ২২ জন এবং ২০১৭ সালে ১৬ হাজার ৭৮০ জন বাংলাদেশি নিজেদের শরণার্থী দাবি করে জাতিসংঘের কাছে আবেদন করেন।
পাঁচ বছরে বাংলাদেশিরা সবচেয়ে বেশি রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন ২০২১ সালে। আর ২০২০ সালে ৬৪ হাজার ৬৩৬ জন নিজেদের রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে ইউএনএইচসিআরের কাছে নিবন্ধিত হয়েছেন। তাঁদের প্রায় সবাই অর্থনৈতিক কারণে দেশ ছেড়েছেন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
উন্নত দেশে যাওয়ার মোহে বিশ্বে বাংলাদেশি শরণার্থী ও রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনাকারী পাওয়া যায় বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, তাঁদের বেশির ভাগ উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমান। যেহেতু অর্থনৈতিক কারণ দেখিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় পাওয়া যাবে না, সে কারণে তাঁরা রাজনৈতিক কারণ দেখিয়ে চলে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে কেন বিদেশে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা? জানতে চাইলে তিনি বলেন, অনেকের ধৈর্য নেই।
বাংলাদেশ পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে, ২০২০ সাল থেকে ২০২১ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঢাকা থেকে দুবাইয়ের ট্যুরিস্ট ভিসা নিয়ে ১ লাখ ৯৯ হাজার ৮৬৪ জন নারী ও পুরুষ দেশ ছেড়েছেন। তাঁদের মধ্যে ফেরত এসেছেন মাত্র ২১ হাজার ৭৫৪ জন। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও ১ লাখ ৭৮ হাজার বাংলাদেশি কোথায় আছেন, তার কোনো ধারণা নেই পুলিশের। এ ছাড়া অন্য দেশের ভিসা নিয়েও ফেরেননি, এমন অনেক মানুষ আছেন। এদের বেশির ভাগেরই বয়স ১৬ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে। পুলিশের হিসাব বলছে, মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছেন অন্তত পৌনে ২ লাখ বাংলাদেশি। তাঁরা বৈধ ভিসা নিয়েই অজানা গন্তব্যের উদ্দেশে দেশ ছেড়েছেন।
গত প্রায় আট বছরে দেশে মানব পাচারসংক্রান্ত ৫ হাজার ৭১৬টি মামলা করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে ২৪৭টি অর্থাৎ মাত্র ৪ শতাংশ মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের হিসাবেও বিচারাধীন আছে ৪ হাজার ৪০৭টি মামলা।
এদিকে মিয়ানমারের সেনাদের নিবর্তনমূলক কর্মকাণ্ডে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে বাংলাদেশে। এর মধ্যে প্রায় ৩৪ হাজার স্বীকৃত শরণার্থী, অন্য সবাই আছে ‘শরণার্থী-পরিস্থিতিতে’। তাদের ফিরিয়ে নিতে দেশটি পাঁচ বছর আগে, ২০১৭ সালের শেষ দিকে চুক্তি করেছে বাংলাদেশের সঙ্গে। দ্বিপক্ষীয়, ত্রিপক্ষীয় ও জাতিসংঘের ব্যবস্থায় বহুপক্ষীয় অনেক বৈঠক হয়েছে। কিন্তু একজনও ফেরেনি নিজেদের ঠিকানা রাখাইনে, এই পাঁচ বছরে। তাদের কথা, রাখাইনের পরিবেশ ফেরার অনুকূল নয়।