পদ্মা সেতু এখন আর স্বপ্ন নয়, বাস্তব। গতকাল শনিবার (২৪ জুন) দেশবাসীকে উচ্ছ্বাসে ভাসিয়ে জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করেন বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেওয়ায় উচ্ছ্বাসে ভাসছেন পদ্মাপাড়ের আশপাশ থেকে শুরু করে দক্ষিণের ২১ জেলার মানুষ। তবে এ উচ্ছ্বাসের মধ্যেই সর্বোচ্চ খেয়াল পদ্মা সেতুর নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব রক্ষার। এই সেতুর নিরাপত্তা ও স্থায়িত্বের কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশ সরকারের সেতু দপ্তর থেকে ২৩ জুন বেশ কিছু বিধিনিষেধ জারি করা হয়। কিন্তু প্রথম দিনে সেই নিয়ম ভেঙেছেন অনেকেই। যেন উচ্ছ্বাস-আবেগ মানে না কোনও বিধি-নিষেধ।
বিষয়টি নিয়ে আজ দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) উম্মে হাবিবা ফারজানা।
তিনি বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে নির্বাহী ক্ষমতা বলে জাজিরা প্রান্তে পরিদর্শন করতে আসলাম। সাধারণ মানুষ সেতুতে উঠে ছবি, সেলফি তুললে কিংবা পদ্মা সেতুর ওপরে বসলেই জরিমানা করা হবে। আমরা প্রথম দিনেই দেখছি সাধারণ মানুষ সেতু পার হতে গিয়ে ছবি তুলছেন। আজ প্রথম দিন শিথিল থাকলেও কাল (সোমবার) থেকেই কঠোর ব্যবস্থা নেবো আমরা।
তিনি আরও বলেন, আগামীকাল (সোমবার) থেকে পদ্মা সেতুতে নেমে ছবি তুললে জরিমানা করা হবে। একই সঙ্গে বাইকের গতি কিংবা নিয়ম না মানলে নেওয়া হবে কঠোর ব্যবস্থা।
রোববার (২৬ জুন) ভোর ৫টা ৫০ মিনিট থেকে স্বপ্নের পদ্মা সেতু দিয়ে যান চলাচল শুরু হয়েছে। এসময় সেতুর দুই প্রান্তে ব্যক্তিগত গাড়ি, বাইক, ভাড়া করা গাড়ি, পণ্যবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী বাসের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। অনেকেই রাতেই চলে এসেছিলেন পদ্মার পাড়ে। রাতভর আড্ডা দিয়েছেন, স্বাদ নিয়েছেন রূপালি ইলিশের। ভোরের আলোর সঙ্গে সঙ্গে পদ্মা সেতুর নান্দনিক সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ নিয়েছেন অনেকেই। যানজটে কিছুটা বিড়ম্বনা হলেও অবিস্মরণীয় এই মুহূর্তের সাক্ষী হতে পেরে উচ্ছ্বসিত সেতু দিয়ে পারাপারকারীরা।
অনেকে হেঁটেই স্বপ্নের পদ্মা সেতু পার হয়েছেন। আবার কেউ কেউ মাঝপথে গাড়ি কিংবা বাইক থামিয়ে তুলেছেন ছবি। অনেকেই ভিডিও কলে স্বজনদের সেতু দেখিয়েছেন। এসময় র্যাবের কিছু সদস্য মাঝে মধ্যে এসে দর্শনার্থীদের সরিয়ে দিলেও উচ্ছ্বাস আর আবেগের কাছে তা ছিল অনেকটাই ক্ষীণ।
তবে এই আবেগ সংবরণের কথা বলা হয়েছিল আগেই। কারণ অতিরিক্তি আবেগ কিংবা উচ্ছ্বাসের কারণে ঘটে যেতে পারে যেকোনও ধরনের দুর্ঘটনা।
২৩ জুন গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে জারি করা নির্দেশনায় বলা হয়, পদ্মা সেতুতে অনুমোদিত গতিসীমা ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার। এর চেয়ে দ্রুত গতিতে গাড়ি চালানো যাবে না।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, তিন চাকা বিশিষ্ট যানবাহন (রিকশা, ভ্যান, সিএনজি, অটোরিকশা ইত্যাদি), হেঁটে, সাইকেল বা নন-মোটোরাইজড গাড়িযোগে সেতু পার হওয়া যাবে না।
আর গাড়ির বডির চেয়ে বেশি চওড়া ও ৫ দশমিক ৭ মিটারের চেয়ে বেশি উচ্চতার মালামালসহ যানবাহন সেতু দিয়ে পার করা যাবে না বলেও জানানো হয়। এছাড়াও সেতুর ওপর ময়লা ফেলা যাবে না বলেও নির্দেশনায় বলা হয়।
পদ্মা সেতু এলাকার নিরাপত্তার জন্য ইতোমধ্যে দুই পাশে দুটি থানা চালু হয়েছে। মুন্সীগঞ্জের লৌহগঞ্জ উপজেলার মেদেনীমন্ডল ও কুমারভোগ ইউনিয়নকে একত্রিত করে ‘পদ্মা সেতু উত্তর থানা’ ও শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার সীমানায় হয়েছে ‘পদ্মা সেতু দক্ষিণ থানা’।
সেতু ও সেতু-ঘেঁষা এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় এ দুটি থানা গঠন করেছে সরকার। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হলেও পদ্মা সেতুসহ গোটা এলাকাটিকে কেপিআই (গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা) ঘোষণার আলোচনা চলছে।
পুরো সেতু ও আশপাশের এলাকায় রয়েছে সিসিটিভি। নিরাপত্তা তদারকিতে দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও পর্যায়ক্রমে দায়িত্ব পালন করছেন।