এমন দিন জাপানের ইতিহাসে আর আসেনি। যে দেশে সহিংসতা নেই বললেই চলে, সেই দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবের মতো রাজনীতিবিদ কি না মারা গেলেন আততায়ীর গুলিতে! শুক্রবারের (৮ জুলাই) এমন এক মৃত্যুতে জাপানিদের দুঃখ ছুঁয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশকেও।
শিনজো আবে জাপানের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি সময় দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী। দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের রঙিন কূটনৈতিক সম্পর্ক বহু পুরনো অধ্যায়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর যে দেশগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে ভূমিকা রেখেছে, জাপান তাদের মধ্যে অন্যতম। শিনজো আবের আমলে সেটি নতুন মাত্রা পায়।
বাংলাদেশের প্রতি শিনোজো আবের মনোযোগ কতটুকু ছিল সেটি বোঝা যায় জাপান টাইমসের ২০১২ সালের একটি প্রতিবেদন থেকে। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে শিনজো আবে তখন ঘোষণা দেন, দক্ষিণ এশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করবেন। নিজের কার্যালয়ে সেদিন সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে একাধিকবার তিনি বাংলাদেশ প্রসঙ্গে কথা বলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত জাপানে একাধিক সরকার পরিবর্তনের কারণে কোনো দেশের সঙ্গেই দ্বি-পাক্ষিক সম্পর্ক অতটা জোরদার হয়নি।
শিনজো আবে ক্ষমতায় এসে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ সফরের ঘোষণা দেন। এর আগে টানা ১৪ বছর কোনো জাপানি প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে আসেননি।
শিনজো আবের সফরের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাপানে গিয়ে দুই দেশের সম্পর্ককে ‘নতুন অংশীদারিত্বে’ এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন।
শিনজো আবে এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ২০১৪ সাল থেকেই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অগ্রযাত্রায় নানা ধরনের সহায়তা করতে থাকেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের সময় আবে জানান, তার সরকার বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নতিতে ছয় বিলিয়ন ডলারের সহায়তা দেবে।
পরে ২০১৯ সালে শেখ হাসিনা আবার রাষ্ট্রীয় সফরে জাপানে যান। তখন আবের সরকার বিভিন্ন প্রকল্পে ২.৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করে।
আবের সঙ্গে শেখ হাসিনার সেই সাক্ষাতের পর দুই দেশের পক্ষ থেকে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ২০৪১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় বিভিন্ন প্রকল্পে সাহায্য করবে জাপান।
আবের কারণেই বাংলাদেশে এখন জাপানি কোম্পানির সংখ্যা অনেক বেশি। ২০০৮ সালে যেখানে ৭০টি জাপানি কোম্পানি বাংলাদেশে ব্যবসা করতো, সেটি এখন প্রায় চারশোর কাছাকাছি।
বাংলাদেশের অধিকাংশ বড় প্রকল্পে জাপানের ভূমিকা উল্লেখ করার মতো। এসব প্রকল্পে জাইকা সাহায্য করে থাকে।
বাংলাদেশের প্রতি শিনজো আবের কতটা সহমর্মিতা ছিল, তা বোঝা যায় ২০১৬ সালের হলি আর্টিজানের হামলার ঘটনায়। ভয়াবহ সেই হামলায় জাপানের সাত নাগরিক মারা যান। ওই হামলাকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ মন্তব্য করে আবে বাংলাদেশের পাশে থাকার ঘোষণা দেন। কোনো সমালোচনা না করে জানিয়ে দেন, সন্ত্রাস মোকাবিলায় তিনি বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করবেন।
রোহিঙ্গা ইস্যুতেও শিনজো আবের ভূমিকা প্রশংসনীয় ছিল। মিয়ানমারে এমনিতে জাপানের প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ থাকায় দেশটি কৌশলী অবস্থান নেয়। শারীরিক সমস্যার কারণে পদত্যাগের আগে তিনি একাধিকবার মিয়ানমারের সঙ্গে সমস্যা সমাধানের বিষয়ে আলাপ করেন।