সদ্য প্রয়াত বরেণ্য সাংবাদিক অমিত হাবিবকে নিয়ে স্মৃতি রোমন্থন করেছেন তার দীর্ঘদিনের সহকর্মী কবি নওশাদ জামিল। নওশাদ জামিল তার ফেসবুক পেজে স্মৃতি রোমন্থন করে লেখেন, 'ক্রিকেট বা ফুটবল ম্যাচ নিয়ে অমিতদা মাঝেমধ্যে ছেলেমানুষের মতো আচরণ করতেন। রীতিমতো হুটহাট 'ঝগড়া' করতেন, তর্ক-বিতর্ক করতেন। তিনি অধিকাংশ সময় তর্ক-বিতর্কে জিততে চাইতেন, ধারালো ও তীক্ষ্ণ যুক্তি দিয়ে জিততেনও। যুক্তিতে অমিতদা কখনও কি হারতেন?'
অমিত হাবিবের সঙ্গে ৫০০ টাকা বাজি নিয়ে নওশাদ জামিল লেখেন, অফিসে কয়েকজন সহকর্মী মিলে অমিতদার সঙ্গে খেলা দেখছিলাম। ইংল্যান্ডকে ২২৫ রানে অলআউট করে দিয়েছিল বাংলাদেশ। অমিতদা বললেন, আমরা কি ২২৬ রান করতে পারব না?
আত্মবিশ্বাস নিয়ে সমস্বরে বলেছিলাম, অবশ্যই পারব। আমরা তো বিশ্বকাপে ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজকেও হারিয়েছি। এবার নিজেদের মাটিতে ইংল্যান্ডকে অবশ্যই হারাতে পারব।
নওশাদ জামিল লেখেন, অমিতদার সন্দেহ দূর হয় না, জয়ের বিশ্বাস আসে না। তিনি বললেন, বাংলাদেশ জিতলে দারুণ ব্যাপার হবে। কিন্তু আপনারা বেশি লাফালাফি বন্ধ করেন, বাংলাদেশ হেরেও যেতে পারে।
নওশাদ জামিল খেলা নিয়ে আরো লেখেন, খেলা দেখছিলাম, দারুণ উত্তেজনায় টগবগিয়ে ফুটছিলাম। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয়ের জন্য বাংলাদেশের শুরুটা দারুণ হয়েছিল। বাংলাদেশ হেসে-খেলে ৩ উইকেট হারিয়ে দেড়শ রান করে ফেলেছিল। তখন জয়ের জন্য পর্যাপ্ত ওভার এবং ব্যাটসম্যানও ছিল। তারপর দেড়শ পেরোনোর পর পরই শুরু হয় বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানের আত্মহত্মার মিছিল। উইকেট পড়ছে তো পড়ছেই। ঝটপট ১৪/১৫ রানে ৫ উইকেট নেই বাংলাদেশের। এ অবস্থায় জয় প্রায় অসম্ভব!
শেষদিকে বাংলাদেশের জয়ের জন্য প্রায় বলে বলে ৬০ রান দরকার ছিল। কিন্তু তেমন ব্যাটসম্যান তো নেই। ১০ নম্বরে ব্যাটিংয়ে নামলেন তরুণ শফিউল ইসলাম। হালকা-পাতলা লিকলিকে গড়নের বোলার শফিউল, তার কাছে কি-বা আশা করা যায়?
অমিতদা খেলা দেখে, ব্যাটসম্যানদের আত্মহনন দেখে বিরক্ত। আমাদের ওপর তুমুল বিরক্তি ঝেড়ে তিনি বললেন, বুঝলেন, বাংলাদেশ দলটা অভিজ্ঞ নয়, পরিণত নয়। এ জন্যই হেরে যাবে। আমি আর খেলা দেখতে পারব না। বাংলাদেশ হেরে যাবে। আমার খারাপ লাগবে।
অভয় দিয়ে অমিতদাকে বলেছিলাম, দাদা খেলা দেখেন, বাংলাদেশ জিতবে।
অমিতদা বলেছিলেন, আপনি কী যে কন? কেমনে জিতবে? শফিউল ভালো ব্যাট করতে পারেন, টেস্টে ওর ফিফটিও আছে। রিয়াদ তো এখনও আছে। জিতবে দাদা।
আমার কথায় দাদা ভরসা পেলেন না, বিরক্তি আর হতাশা নিয়ে ছুটলেন নিউজ রুমের দিকে। নওশাদও অমিত হাবিবের সঙ্গে নিচতলায় নিউজ রুমের দিকে যাচ্ছেন। দুতলা থেকে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বলেন, 'দাদা, আপনার সাথে ৫০০ টাকার বাজি ধরলাম'। বাংলাদেশ জিতবেই।
৫০০ টাকার বাজি শুনে অমিতদা হাসলেন, 'তারপর দ্রুত পা চালিয়ে বললেন, আচ্ছা, বাংলাদেশ জিতলে আপনাকে লাঞ্চ করাব'।
নিউজ রুমে টিভি সেটের সামনে জড়ো হয়ে খেলা দেখছিলেন অনেকেই। সবাই উত্তেজিত, উদ্বিগ্ন। কেউ উত্তেজনায় চিল্লাচিল্লি করছে, কেউ চুপ হয়ে নখ কামড়াচ্ছে! সফেদদা (সফেদ ফরাজী) শফিউলের চার মার দেখে বাচ্চাদের মতো নাচছিলেন, উচ্চ:স্বরে চিল্লাচ্ছিলেন। সেদিন শফিউলের ভেতর কী যেন ভর করেছিল! বোলার শফিউল রীতিমতো পাক্কা ব্যাটসম্যান হয়ে উঠেছিলেন, চার-ছক্কা মেরে বাংলাদেশকে জিতিয়েছিলেন! পরদিন দাদা আমাকে লাঞ্চ করিয়েছিলেন!
তিনি লেখেন, '২০১১ বিশ্বকাপের সময় অমিতদা বললেন, কবি-লেখকের মধ্যে কারা ক্রিকেট পছন্দ করেন, নিয়মিত খেলা দেখেন, আপনি সব খোঁজখবর নিন। তাদের কাছ থেকে লেখা নিন। ব্যাক পেইজে আপনি ফিচার করবেন, সঙ্গে একজন কবি-লেখকের লেখা রাখবেন।'
নওশাদ লেখেন, 'আমি ব্যাক পেইজের জন্য আবদুশ শাকুর, মোহীত উল আলম, মঈনুল আহসান সাবের, ফরিদ কবির, সিদ্ধার্থ হকসহ অনেক কবি-লেখকের লেখা নিয়েছিলাম, ছেপেছিলাম। সবার নাম মনেও পড়ছে না এখন। (ক্রিকেট নিয়ে যারা লিখেছিলেন, তাদের লেখক সম্মানী দিতে চাচ্ছিল না কেউ কেউ, শেষমেশ অমিতদা ও মোস্তফা মামুন ভাই লেখকদের টাকার ব্যবস্থা করেছিলেন।)
এরপর ফুটবল বিশ্বকাপ নিয়ে লেখেন, 'অমিতদা আর্জেন্টিনার সাপোর্টার, আমি ব্রাজিলের। যার ফলে দাদার সঙ্গে মাঝেমধ্যে খটমট লেগে যেতো। ২০১০ বিশ্বকাপের কথা। একযুগ আগের কথা। অমিতদা বললেন, বিশ্বকাপ নিয়ে আমরা ঢাকার বিভিন্ন স্কুল-কলেজে অনুষ্ঠান করব, আপনি প্রতিদিন ফিচার করবেন। তখন যে কত স্কুল-কলেজে গিয়েছি, কত যে ফিচার করেছি! মোটামুটি ১১/১২ বছরে কালের কণ্ঠে হাজার হাজার নিউজ, ফিচার লিখেছি। অমিতদার ব্যাকআপ না থাকলে তা পারতাম না বোধহয়।
'নিজের বিটের বাইরেও আমাকে দিয়ে প্রচুর কাজ করাতেন অমিতদা। আমাকে ব্যাপক খাটাতেন, রীতিমতো দৌড়ের ওপর রাখতেন। একবার কক্সবাজার গেলাম ঘুরতে, বেড়াতে। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে গিয়েছিলাম। অমিতদা ফোন করে বললেন, একঢিলে দুই পাখি মারেন, এখনই রামুতে ছুটেন। বৌদ্ধদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, আপনি তাদের অবস্থা নিয়ে সরেজমিন করেন। এ রকম অসংখ্য নিউজের স্মৃতি, অসংখ্য আড্ডা ও তর্ক-বিতর্কের স্মৃতি তার সঙ্গে জড়িয়ে।'
নওশাদ জামিল লেখেন, অমিতদা আমাকে সাহিত্য ও সংস্কৃতির বাইরে অন্য কোনো সেক্টরে বসাতে চেয়েছিলেন, অন্য কোনো বিটে আমাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কালের কণ্ঠের শুরুর দিকে, যখন জ্বালানি বিটের একজন রিপোর্টার চলে গিয়েছিল, তখন অমিতদা বললেন, আপনি জ্বালানি বিট শুরু করেন! আপনি দারুণ করবেন। আমি 'না' করায় আমাদের আরিফুজ্জামান তুহিন জ্বালানি বিট শুরু করেছিল। সেসব অনেক আগের কথা।
অমিত হাবিবের শিল্প-সাহিত্য জানা-শোনা নিয়ে নওশাদ লেখেন,'শিল-সাহিত্যে দারুণ পঠন-পাঠন ছিল, বিস্তর জানা-শোনা ও পাণ্ডিত্য ছিল অমিতদার। যার ফলে তিনি কবি-লেখকের সঙ্গে আড্ডা পছন্দ করতেন। আমার সঙ্গে লেখালেখির সূত্রেই হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক হয়েছিল।'
'কহনকথা: সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাতকার' নিয়ে নওশাদ জামিল লেখেন, ;আক্ষরিকভাবে তার সূচনা হয়েছিল ২০০৮ সালে। প্রায় ১৪ বছর আগে আমি ও সোহেল হাসান গালিব একটা সম্পাদিত বই প্রকাশ করেছিলাম, । ওই বইটা ছিল সেলিম আল দীনের বাছাই সাক্ষাতকার সংকলন। তাতে অমিতদার নেওয়া সেলিম আল দীনের একটা বড় সাক্ষাতকার ছিল। একদিন দাদাকে বইটি দেওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, এই সাক্ষাতকার আপনি কোথায় পেলেন, কীভাবে পেলেন! এটা তো অনেক আগে ছাপা হয়েছিল। আশ্চর্যজনক ব্যাপার।'
'সেলিম আল দীনকে নিয়ে মজার স্মৃতিচারণা করতেন অমিতদা, বিভিন্ন সময় আড্ডায়-আলাপে বলতে বলতে উদাস হয়ে যেতেন। একদিন এক আড্ডায় উদাস হয়ে, কিছুটা আফসোসের সুরে তিনি বলেছিলেন, আপনাদের সেলিম আল দীন কবি হতে চেয়েছিলেন, কবি হতে পারেননি। নাট্যকার হয়ে গিয়েছিলেন। আমিও কবি হতে চেয়েছিলাম। একটু-আধটু চেষ্টা করেছিলাম, কবি হতে পারিনি। সাংবাদিক হয়ে গেছি।'
সিগারেটের ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে একটানে কথাগুলো বলেছিলেন অমিতদা। তারপর উচ্চ:স্বরে হেসেছিলেন। তিনি যখন কথাগুলো বলছিলেন, আফসোস ঢেকে হাসছিলেন, আমি তখন তার মুখের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিলাম, আমার মনে হচ্ছিল, নিষ্ঠুর শহরে কবিমন নিয়ে বেঁচে আছেন তিনি।
নওশাদ জামিল লেখেন, সেলিম আল দীন ৫৮ বছর বয়সে চলে গেছেন, অমিত হাবিবও ৫৮ বছর বয়সে চলে গেলেন! সত্যিই কী তারা চলে গেছেন, কবিমন নিয়ে বারবার ফিরে আসবেন না তো?