শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে পিইসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করেছিলেন যশোরের ‘অদম্য মেধাবী’ তামান্না আক্তার নুরা। একটি মাত্র পা দিয়ে লিখে এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নও পূরণ করলেন তিনি। তামান্না নুরার দুই হাত ও ডান পা নেই। বাঁ পা দিয়ে লিখেই তিনি অর্জন করে চলেছেন একের পর এক সাফল্য। সাফল্যের ধারাবাহিকতায় এবার সেই তামান্না গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (৪ আগস্ট) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ওয়েবসাইটে গুচ্ছের ‘ক’ ইউনিটের ফল প্রকাশিত হয়। এবারের পরীক্ষায় পাসের হার ৫৫ দশমিক ৬৩ শতাংশ। এর মধ্যে প্রকাশিত ফলাফলে তামান্নার নম্বর এসেছে ৪৮.২৫। গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তামান্না আক্তার নুরা নিজেই।
তামান্না যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) কেন্দ্রে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন।
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার বাঁকড়া আলীপুর গ্রামের তামান্নার জন্ম থেকে দুটি হাত নেই। নেই ডান পা। আছে শুধু বাম পা। সেই পা দিয়ে লিখে পিইসি (প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা), জেএসসি (জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা), এসএসসি (সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা) এবং এইসএসসিতে (হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা) জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন তামান্না আক্তার।
তামান্নার বাবা রওশন আলী ঝিকরগাছা উপজেলার ছোট পৌদাউলিয়া মহিলা দাখিল মাদ্রাসার (নন–এমপিও) শিক্ষক। মা খাদিজা পারভীন গৃহিণী। তাঁদের তিন ছেলেমেয়ে। তামান্না সবার বড়। ছোট বোন মুমতাহিনা রশ্মি ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। ভাই মুহিবুল্লা তাজ প্রথম শ্রেণিতে পড়ে।
তামান্না আক্তার গণমাধ্যমকে জানান, ২২টি সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে গুচ্ছ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা হয়েছে। পরীক্ষার ফলাফলে ৪৮ দশমিক ২৫ নম্বর পেয়ে মেধাতালিকায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। দুই-এক দিনের মধ্যে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চান, তা নির্বাচন করে আবেদন করতে হবে। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (যবিপ্রবি) মাইক্রোবায়োলজি বিষয়ে পড়তে চান। এ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা হতে চান তিনি।
তামান্নার মা খাদিজা পারভীন বলেন, ২০০৩ সালের ১২ ডিসেম্বর তামান্নার জন্ম। ওর জন্মের পর কষ্ট পেয়েছিলেন। পরে ভেবেছেন, ওকে কারও বোঝা হতে দেওয়া ঠিক হবে না। ছয় বছর বয়সে ওর পায়ে কাঠি দিয়ে লেখানোর চেষ্টা শুরু করেন। কলম দেন। কাজ হলো না। এরপর মুখে কলম দেন। তাতেও কাজ হয়নি। পরে সিদ্ধান্ত নেন, ওকে পা দিয়েই লেখাতে হবে। এরপর বাঁকড়া আজমাইন এডাস স্কুলে ভর্তি করান। মাত্র দুই মাসের মাথায় ও পা দিয়ে লিখতে শুরু করল। এরপর ছবি আঁকা শুরু করে।
এ বিদ্যালয় থেকে ২০১৩ সালে পঞ্চম শ্রেণির প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় (পিইসি) জিপিএ-৫ পায় তামান্না। বৃত্তিও পায়। পঞ্চম শ্রেণি পাসের পর তামান্নাকে বাঁকড়া জনাব আলী খান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় (জেএসসি) সে জিপিএ-৫ পায়। ২০১৯ সালে সে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায়। এরপর তাকে বাঁকড়া ডিগ্রি কলেজে ভর্তি করা হয়। সেখান থেকে এবারের এইচএসসিতে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে সে জিপিএ-৫ পেয়েছিল।