দেশে তিন কারণে ডিসঅ্যাপেয়ার (গুম) হয় বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।
রোববার (১৪ আগস্ট) সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে ঢাকা সফররত জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাচেলেটের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি এ কথা বলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি (হাইকমিশনার) আগেই আমাদের কিছু লিখিত প্রশ্ন দিয়ে দিয়েছিলেন। যেগুলো নিয়ে তিনি আলাপ করতে চেয়েছিলেন। তাদের জিজ্ঞাসা ছিল, অনেকে মিসিং হয়ে যায়। অনেক নৃশংসতা বাংলাদেশে হয়েছে, সেগুলো নিয়ে আমরা কী করেছি? এছাড়া দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি নিয়েও জিজ্ঞাসা করেছেন। আমরা তাকে বলেছি, আমাদের জাতির পিতা যিনি আমাদের দেশ স্বাধীন করেছেন। যেখানে ৩০ লাখ মানুষের রক্ত ঝরেছে, ২ লাখ মা-বোনের চরম আত্মত্যাগ রয়েছে। স্বাধীনতার সাড়ে ৩ বছরের মাথায় জাতির পিতাকে শাহাদাতবরণ করতে হয়েছে। কাজেই সবসময় আমাদের দেশে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্ত লেগেই আছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা অন্ধকার যুগ পেরিয়ে যার ধমনীতে বঙ্গবন্ধুর রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশ চলছে। আমরা সেই অন্ধকার থেকে বাংলাদেশ তৈরি করেছি। আমাদের বিচার বিভাগ স্বাধীন। আমাদের সব সংবাদপত্র স্বাধীন। আমাদের এখানে এক হাজার ২৬৫টি স্বীকৃত দৈনিক সংবাদপত্র। সব মিলিয়ে সংবাদপত্র আছে ৩ হাজার ১৫৪টি, টিভি চ্যানেল আছে ৫০টি। এগুলো স্বাধীনভাবে তাদের মতামত প্রচার করছে। তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্বাধীনতা পেয়ে তারা যা ইচ্ছা প্রকাশ করে থাকে, মতামত প্রকাশ করে থাকে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়েও তিনি কথা বলেছেন। আমরা বলছিলাম, এটার সবচেয়ে বড় শিকার হলেন মহিলা ও শিশুরা। খুব কম সংখ্যক ৩ শতাংশের বেশি নয় রাষ্ট্রীয়ভাবে মামলা হয়েছে। এদের নিরাপত্তার জন্যই আইনটি ছিল। আইনমন্ত্রী বলেছেন, এটাকে আরেকটু সতর্কতার সঙ্গে প্রয়োগ করতে, আমরা সেটাই করছি। এখন কেউ মামলা করলে আমরা দেখি সে অপরাধটা করেছে কিনা- অপরাধ করলে মামলাটা নেওয়া হয়। তিনি বলেছেন, আইনমন্ত্রীর সঙ্গেও কথা বলেছি।’
মন্ত্রী বলেন, ‘৭৬ জনের মিসিং বা ডিসঅ্যাপেয়ারেন্স পার্সনের তালিকা দেওয়া হয়েছিল। আমরা দেখিয়ে দিয়েছি, এই ৭৬ জনের মধ্যে ১০ জন তাদের বাড়িতেই আছে। দুজন জেলখানায় আছেন। আমরা তাকে বলেছি, আমাদের দেশে তিনটি কারণে ডিসঅ্যাপেয়ার (গুম) হয়। প্রথম কারণ হচ্ছে- ঘৃণ্য অপরাধ যারা করে, ভিডিওর মাধ্যমে আমরা দেখিয়েছি। পুলিশকে পিটিয়েও তারা হত্যা করেছে। আমরা এটাও দেখিয়েছি, কীভাবে তারা মানুষের সম্পদ ধ্বংস করেছে। যারা এগুলো করেছে তারা সীমান্তের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বিভিন্ন দেশে চলে গেছে। তারা ভারত বা মিয়ানমার কিংবা অন্য কোনো জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। বাকিগুলো সব আমাদের সঙ্গেই আছে। আজকে বিচার বিভাগ স্বাধীন, কাজেই বিচার এড়ানোর জন্যই তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। সেটার একটা নমুনা আমরা তাকে দেখিয়েছি। কী ধরণের অপরাধ তারা করেছে’।
‘এছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যে ঋণে যারা জর্জরিত তারা গা ঢাকা দেয়। হয়তো কয়েকদিন পরে আত্মপ্রকাশ করে। আবার যারা পারিবারিকভাবে অসুবিধায় পড়ে তারাও গা ঢাকা দেয়। এ তিন ধরনের লোকদের গা ঢাকা দিতে দেখেছি। এটা কমিশনারকে বলেছি। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাদের গ্রেপ্তার করে তাদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে সোপর্দ করে দিই।’
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নেত্রনিউজ সব সময় ভুয়া নিউজ দিয়ে থাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে। আমরা এগুলোকে নিউজ বলে মনে করি না। আমাদের দেশের যে ঘটনা, আমাদের দেশের মিডিয়া ফ্রি। তারা যে কোনো সংবাদ সবসময়ই প্রকাশ করে থাকেন। আমরা কোনো মিডিয়ার ওপর কোনো সেন্সর করি না। কাজেই কোথাকার কোন নিউজ কী বললো আমরা সেগুলোর কোনো বাস্তবতা খুঁজে পাই না।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘গুম দিবস যারা করেন তারা একটা উদ্দেশ্য নিয়েই করেন। তারাও জানেন তাদের ছেলেটি কিংবা ভাইটি কিংবা তার মেয়েটি কোথায় আছেন। আমরা এটুকু বলতে চাই যে, আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাদের নিয়ে যায় তাদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই কোর্টে সাবমিট করতে হয়। কেউ যদি ইচ্ছে করে গুম হয়ে যায়, কেউ যদি কাঁটাতারের ফাঁক দিয়ে বিদেশে চলে যায় কিংবা সমুদ্রপথে যদি চলে যায়, যেটাকে আমরা মানবপাচার বলি, সেখানে যারা চলে যায় আমাদের তো তাদের বের করতে যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন হয়। কাজেই যারা এগুলো বলছেন এগুলো আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী দেখছেন। আমরা যাকেই খুঁজে পাবো তাকে আমরা প্রকাশ করে দেখাবো।’
রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমান কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না, এ বিষয়ে জাতিসংঘ কী করতে পারে, সেই বিষয়ে কোনো কথা হয়েছে কি না- জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, ‘তারা বলছেন প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। জাতিসংঘের সব সংস্থাই বলছেন, আমাদের সঙ্গে সবাই কথা হচ্ছে। মিয়ানমারের সরকারের অবস্থা ভালো না, এ মুহূর্তে সম্ভব হচ্ছে না- এটাই তারা বলে যাচ্ছেন, বলছেন।’
র্যাবের কর্মকর্তাদের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে কোনো কথা হয়েছে কি না জানতে চাইলে আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনো আলাপ হয়নি। আমরা ভিডিওর মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছি। তাকেও (কোনো ব্যক্তি তা বলেননি) বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। নিম্ন আদালতে তার বিচার হয়েছে এবং উচ্চ আদালতে এটা চলছে। পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা কারাগারে রয়েছেন বিচারের পর।’