বরেণ্য নাট্যকার এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি প্রয়াত সেলিম আল দীনের জন্মবার্ষিকী ১৮ আগস্ট (বৃহস্পতিবার)।
সেলিম আল দীন ১৯৪৯ সালের এই দিনে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার সেনেরখিল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার এবং একুশে পদকজয়ী বরেণ্য এই নাট্যকার ২০০৮ সালের ১৪ জানুয়ারি মারা যান।
নাটক রচনায় ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাটকের রচনারীতি এবং পরিবেশনাশৈলীর নতুন রূপ নির্মাণের মাধ্যমে নাটক লিখেছেন সেলিম আল দীন। ফলে অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলা নাটকের অত্যাবশ্যক রূপ হিসেবে নির্ণীত হওয়া ইউরোপীয় সংলাপাত্মক নাটকের গড়ন-বৈশিষ্ট্য ভেঙে যায়।
একই সঙ্গে সংস্কৃত কিংবা ইউরোপীয় নাট্যরীতি চিহ্নিত হয় ‘বিজাতীয়’ বা ‘পরজীবী’ নাট্যচর্চা হিসেবে। অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতাব্দীতে বঙ্গীয় জনপদে পাশ্চাত্য প্রভাবিত নাট্যচর্চার বিস্তৃতি ঘটে। ‘বিজাতীয়’ তথা ‘পরজীবী’ এই নাট্যচর্চার বিপরীতে একসময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শম্ভু মিত্র প্রমুখের নাট্য-আঙ্গিক বিকশিত হয়। তারই ধারাবাহিকতায় স্বাধীন বাংলাদেশের নাট্যচর্চায় সেলিম আল দীন ঐতিহ্যবাহী নাট্য-আঙ্গিকের নানা শৈলীকে নতুনরূপে সৃষ্টি করেন। সেলিম আল দীন স্বীয় নাটকে ঔপনিবেশিক নাট্য-শৃঙ্খলার বিপরীতে দেশজ-নাট্যরীতির নবরূপ নির্মাণের মাধ্যমে উন্মোচন করেন আধুনিক বাংলা নাট্যের রূপ। এটি তিনি প্রমাণ করেছেন যে বাংলা ভাষায় লিখিত হলেই বাংলা নাটক হয় না; বরং হাজার বছর ধরে বাঙালির নাট্য-নন্দন ভাবনার কাঠামোর স্বতন্ত্র ও স্বকীয় ব্যবহারেই বাংলা নাটকের গড়ন-গঠন বিকশিত হওয়া প্রয়োজন। আর বাঙালির জীবনে প্রাচীনকাল থেকে পরিবাহিত হয়ে চলা কথা-নৃত্য-গীতের অপ্রয়াস যাতায়াতের মধ্য দিয়েই বিকশিত হয় বাংলা নাটক।
আধুনিক বাংলা নাটকের বিকাশ-পরিক্রমায় ঐতিহ্যবাহী বাংলা নাট্যের উপাদানগুলোর মধ্যে কথা-নৃত্য-গীতের বহুমাত্রিক ব্যবহার করেন সেলিম আল দীন। তাঁর নাটকের বর্ণনা, সংলাপ প্রভৃতির মধ্যেও ঐতিহ্যবাহী নাট্যের ‘গীতলতা’, ‘গীতময়তা’ ও ‘কাব্যময়তা’র অপরিহার্য সংযোগ বিদ্যমান। এসব কারণেই তিনি যেমন ঐতিহ্যিক বাংলা নাটকের বিনির্মাণে স্বতন্ত্র ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, একই সঙ্গে বাঙালির দ্বৈতাদ্বৈত শিল্পরীতির বিস্তৃত ভূমিও নব আলোয় আলোকিত হয়। স্বতন্ত্র শিল্পতত্ত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায় ‘দ্বৈতাদ্বৈতবাদ’।