সাবেক নির্বাচন কমিশনার (ইসি) মাহবুব তালুকদারের নামাজে জানাজা শুক্রবার (২৬ আগস্ট) বাদ জুমা জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে অনুষ্ঠিত হবে।
বৃহস্পতিবার (২৫ আগস্ট) তার মেয়ে আইরিন মাহবুব গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আইরিন মাহবুব গণমাধ্যমকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে আমার দুই ভাই আজকে রাতের মধ্যে দেশে ফিরবেন। শুক্রবার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে বাবার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি আরও বলেন, বাবার ইচ্ছা ছিল রাজধানীর মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে যেন তার দাফন হয়। এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে, এখনো কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।
সাবেক ইসি মাহবুব তালুকদারের মরদেহ রাজধানীর বারডেম জেনারেল হাসপাতালে রাখা হয়েছে। বুধবার (২৪ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে মরদেহটি সেখানে রাখা হয়। দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে ভুগছিলেন মাহবুব তালুকদার। বুধবার দুপুরে হঠাৎ অসুস্থ বোধ করলে তাকে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।
মাহবুব তালুকদারের কর্মজীবন ছিল বৈচিত্র্যময়। একসময় তিনি সাংবাদিকতা করেছেন। যুক্ত হয়েছেন শিক্ষকতা পেশায়। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন শব্দসৈনিক হিসেবে। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি যোগ দেন সরকারি চাকরিতে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ বঙ্গভবনে চারজন রাষ্ট্রপতির অধীন তিনি কাজ করেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তাঁকে ক্যাডার সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল।
আমলা হিসেবে অবসর নেওয়ার পর তিনি নির্বাচন কমিশনার মনোনীত হন। কে এম নূরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনে স্বতন্ত্র অবস্থানের কারণে তিনি ছিলেন প্রশংসিত। নির্বাচনসংক্রান্ত নানা অনিয়ম নিয়ে কমিশনের ভেতরে–বাইরে বক্তব্য দিয়ে পাঁচ বছর মাহবুব তালুকদার ছিলেন আলোচনায়।
তিনি নিজেকে ‘নির্বাক জনগণের নীরব ভাষার মুখপাত্র’ হিসেবে উল্লেখ করতেন। মাহবুব তালুকদারের আরেকটি সত্তা ছিল, তিনি ছিলেন কথাশিল্পী ও কবি। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেন তিনি। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ হয় তাঁর।
নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, মাহবুব তালুকদার ১৯৪২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলায়। তিনি ঢাকা নবাবপুর হাইস্কুল, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। পরে তিনি ঢাকা জগন্নাথ কলেজ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগ ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষকতা করেন। ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন ও মুজিবনগর সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের চাকরিতে যোগ দেন।
এ সময় তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী তাঁকে উপসচিবের পদমর্যাদায় রাষ্ট্রপতির স্পেশাল অফিসার নিযুক্ত করেন। রাষ্ট্রপতি মুহম্মদ উল্লাহর জনসংযোগ কর্মকর্তা ছিলেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর মাহবুব তালুকদার তাঁর সহকারী প্রেস সচিবের (উপসচিব) দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তাঁকে তদানীন্তন ক্যাডার সার্ভিসে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যা পরে বিসিএস প্রশাসন হিসেবে রূপান্তরিত হয়।
একসময়ে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন। চাকরিজীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ সংসদ সচিবালয়ে অতিরিক্ত সচিব ছিলেন। তিনি ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব শুরু করেন। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ হয়।
মাহবুব তালুকদার একজন সৃজনশীল লেখক। কবিতা, গল্প, উপন্যস, স্মৃতিকথা, ভ্রমণকাহিনি মিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ৪০। তিনি ২০১২ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান। তাঁর স্ত্রীর নাম নীলুফার বেগম। এ দম্পতির দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে।