মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আলবদর কমান্ডার, স্বাধীনতাবিরোধী জামাতের মূল অর্থ যোগানদাতা মীর কাসেম আলীর ফাঁসির রায় বহাল রেখেছে আপিল বিভাগ।
মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৯টার কিছু পরে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ এ রায় ঘোষণা করে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে ১৪টি অপরাধের মধ্যে চট্টগ্রামের ডালিম হোটেলে অপহরণের পর আটকে রেখে নির্যাতন, হত্যাসহ ১০টি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর দুটি অভিযোগে ৮ জনকে হত্যার দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে দেয়া হয় ৭২ বছর কারাদণ্ড।
১৯৭১ সালের ৮ নভেম্বর মীর কাসেমের নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী ওমরুল ইসলাম চৌধুরীকে অপহরণ করে, পরে চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার ডালিম হোটেল, পাঁচলাইশ থানার সালমা মঞ্জিল এবং চামড়ার গুদামে নিয়ে নির্যাতন।
১৯ নভেম্বর চাকতাই থেকে লুৎফর রহমান ফারুককে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নির্যাতন। মীর কাসেমের নেতৃত্বে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে নির্যাতন। শহীদ জসিম উদ্দিনসহ ৬ জনকে অপহরণের অপর হত্যা।
এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল আবেদনের দীর্ঘ তেরো মাস পর এ বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি মীর কাসেমের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের দেয়া রায়ের নথিপত্র পাঠের মধ্যে দিয়ে শুরু হয় আপিল শুনানি। ৭ কার্যদিবসে দুই পক্ষের শুনানি শেষে আজ রায়ের দিন ধার্য করে আপিল বিভাগ।
মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে গঠন করা ১৪টি অভিযোগের মধ্যে ট্রাইব্যুনালে ১০টি প্রমাণিত হয়। ১০টির মধ্যে ১১ ও ১২ নম্বর অভিযোগে আটজনকে নির্যাতনের পর হত্যার দায়ে তাকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়। বাকি আটটি (২,৩, ৪,৬, ৭,৯, ১০ ও ১৪ নম্বর) অভিযোগে ১৭ জনকে নির্যাতনের দায়ে তাকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়।
এরমধ্যে ৬টি অভিযোগে সাত বছর করে কারাদণ্ড, একটিতে ২০ বছর ও একটিতে ১০ বছর কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল।
ট্রাইব্যুনালে ফাঁসির আদেশ পাওয়া ১১ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, একাত্তরে পবিত্র ঈদুল ফিতরের পর কোনো এক দিন মীর কাসেমের নির্দেশে আলবদররা মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে অপহরণ করে। এরপর তাকে ডালিম হোটেলে বন্দী রেখে নির্যাতন ও ২৮ নভেম্বর হত্যা করা হয়। পরে ডালিম হোটেলে নির্যাতনে নিহত আরও ৫ জনের সঙ্গে জসিমের মরদেহ কর্ণফুলী নদীতে ফেলে দেয়া হয়।
১২ নম্বর অভিযোগ অনুসারে, একাত্তরের নভেম্বরে মীর কাসেমের নির্দেশে আলবদররা চট্টগ্রামের হাজারী গলি থেকে রঞ্জিত দাস ও টুন্টু সেনকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে যায়। পরে তাদের হত্যা করে মরদেহ গুম করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী দল জামাতের শীর্ষস্থানীয় নেতা মীর কাসেম একাত্তরে ছিলেন দলটির ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের চট্টগ্রাম শহর শাখার সভাপতি। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৭ সালে ইসলামী ছাত্র সংঘ নাম বদল করে ছাত্রশিবির নামে রাজনীতি শুরু করে। মীর কাসেম ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ওই সময় থেকে তিনি জামাতের রাজনীতিকে শক্তিশালী করতে দলটির অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্ত করার জন্য উদ্যোগ নিতে শুরু করেন।
১৯৮০ সালে তিনি রাবেতা আল-আলম আল-ইসলামী নামের একটি বিদেশি বেসরকারি সংস্থার এদেশীয় পরিচালক হন। এছাড়া তিনি দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনের চেয়ারম্যান, ইবনে সিনা ট্রাস্টের অন্যতম সদস্য। ধীরে ধীরে তিনি জামাতের অর্থের অন্যতম জোগানদাতায় পরিণত হয়।