বিচারক নিয়োগসংক্রান্ত সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ ও অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি, পদোন্নতিসংক্রান্ত সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করা হয়েছে।
অনুচ্ছেদ দুটিকে সংবিধানের ৩০ ও ৩৯ অনুচ্ছেদের সঙ্গে কেন সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না—এই মর্মে রিটে রুল চাওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকালে রিট আবেদনটি করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনূস আলী আকন্দ।
রিটে আইনসচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারসহ চারজনকে বিবাদী করা হয়েছে। সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ নিয়ে চলমান আলোচনার মধ্যেই এই রিটটি হলো।
গত সোমবার নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক্করণের নয় বছর পূর্তি উপলক্ষে এক বাণীতে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বলেন, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ বিচার বিভাগের ধীরগতির অন্যতম কারণ। তিনি আরো বলেন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে প্রণীত ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদটি পুনঃপ্রবর্তন হওয়া সময়ের দাবি।
রিটকারী আইনজীবী বলেন, আগামী রোববার রিটটি শুনানির জন্য আদালতে উপস্থাপন করা হবে।
তিনি ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর সময় আনা চতুর্থ সংশোধনী এবং ২০১১ সালে করা পঞ্চদশ সংশোধনীতে সংবিধানের ৯৫ এর ১ ও ২ এর ‘বি’ এবং ১১৬ অনুচ্ছেদে আনা পরিবর্তনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে।
রিটে বর্তমান সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদে সুপ্রিম কোর্টে বিচারক নিয়োগ ও যোগ্যপতা নিয়ে বলা হয়েছে। ৯৫ এর ১ ধারায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেবেন। প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি অন্যান্য বিচারককে নিয়োগ দিবেন।
আর ৯৫ এর ২ (বি) ধারায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ন্যূ নতম দশ বছর কোনো বিচার বিভাগীয় পদে দায়িত্ব পালন না করলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হওয়ার যোগ্যা হওয়া যাবে না।
সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, বিচার-কর্মবিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের এবং বিচারবিভাগীয় দায়িত্বপালনরত ম্যাজিস্ট্রেটদের নিয়ন্ত্রণ (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি ও ছুটি মঞ্জুরিসহ) ও শৃঙ্খলাবিধান রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শক্রমে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা প্রযুক্ত হবে।
এসব ধারা কেন সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করা হবে না- তা জানতে রুল চেয়েছেন ইউনুছ আলী।
এতে স্পিকার, আইন সচিব, মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রারকে এতে বিবাদী করা হয়েছে।
গত ৩১ অক্টোবর – সোমবার এসব অনুচ্ছেদ অনুসারে অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদোন্নতি, বদলি এবং শৃঙ্খলামূলক কার্যক্রম সুপ্রিম কোর্টের পক্ষে এককভাবে গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না। দ্বৈত শাসনের ফলে বহু জেলায় শূন্য পদে সময়মত বিচারক নিয়োগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে বিচার কাজে বিঘ্ন ঘটে এবং বিচারপ্রার্থী জনগণের ভোগান্তি বেড়ে যায়—মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপতি।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যপমে ৭২ এর সংবিধানের চার মূলনীতি ফিরিয়ে আনা হয়। তবে ১১৬ অনুচ্ছেদে বাহাত্তরের সংবিধান আর ফেরেনি; অধস্তন আদালতের বিচারকদের পদোন্নতি, বদলির ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতেই থেকে গেছে।
এই প্রেক্ষাপটে ১৯৭২ সালের সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদটি পুনঃপ্রবর্তন করা ‘সময়ের দাবি’ বলে মত দেন প্রধান বিচারপতি।
এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক পরদিন সাংবাদিকদের বলেন, প্রধান বিচারপতির প্রস্তাব ‘স্ববিরোধী’ এবং ১১৬ অনুচ্ছেদ বদলানোর ‘দরকার নেই’।
এর ব্যা খ্যািয় উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণের বিষয়ে বাহত্তরের সংবিধানের বিধান ফিরিয়ে আনার পর হাইকোর্টের প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি সামনে আনেন আইনমন্ত্রী।
১৯৭২ সালে মূল সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের উপর ন্যস্ত ছিল।
১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ওই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত হয়। পরে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের কাছে ন্যস্ত হয়।
২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু একটি রিট আবেদনে চলতি বছরের ৫ মে হাইকোর্ট ওই সংশোধন অবৈধ ঘোষণা করে। বিষয়টি এখন আপিল বিভাগে আছে বলে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন।
সচিবালয়ে এ সংবাদ সম্মেলনে আনিসুল হক বলেন, একদিকে বলা হচ্ছে ওইটা (৯৬ অনুচ্ছেদ) হিস্টরিক্যাল মিসটেক আবার বলা হচ্ছে ১১৬ অনুচ্ছেদে বাহাত্তরে যা আছে তাতে ফিরে যেতে হবে এটা তো প্রধানবিচারপতির স্ববিরোধী কথা।