গত বছরের ১৫ জুলাই মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে জামাতের সাবেক আমির রাজাকার শিরোমনি গোলাম আযমকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। তার বিরুদ্ধে আনা ৫টি অভিযোগই প্রমাণিত হয়েছে। ওইদিন বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীরের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১ এ রায় ঘোষণা করা হয়।
আদেশে ট্রাইব্যুনাল জানায়, তিনি (গোলাম আযম) যে অপরাধ করেছেন তা মৃত্যুদণ্ডতুল্য। কিন্তু তার বয়স বিবেচেনা করে ট্রাইব্যুনাল তাকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হলো।
২৪৩ পৃষ্টার রায়ে ৭৫ পৃষ্ঠার সারসংক্ষেপ পড়া হয়। প্রথম অংশ পড়েন বিচারক প্যানেলের সদস্য বিচারপতি আনোয়ারুল হক।
শুরুতেই ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর সূচনা বক্তব্য বলেন, ১৯৭১ সালে গোলাম আযম পরিচিত ব্যক্তি এবং তিনি ওইসময়কার পূর্ব পাকিস্তান জামাতে ইসলামের আমির ও কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটিরও একজন প্রভাবশালী সদস্য ছিলেন।
এছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সময় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ হিসেবে যুদ্ধাপরাধের দায়-দায়িত্ব গোলাম আযমের ওপর বর্তায় বলেও উল্লেখ করেন বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর।
ও্ইদিন সকাল ১০টার দিকে গোলাম আযমকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি মাইক্রোবাসে করে ট্রাইব্যুনালে নিয়ে আসা হয় তাকে। প্রথমে ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় পরে এজলাসে তোলা হয়।
শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালের কারাকক্ষে আটক ছিলেন।
গোলাম আযমের বিরুদ্ধে প্রমাণিত পাঁচ ধরনের অভিযোগ :
অভিযোগগুলোর মধ্যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র সংক্রান্ত ৬টি, তাদের সঙ্গে সহযোগিতা সংক্রান্ত ৩টি, উস্কানি দেয়ার ২৮টি, তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও হত্যা-নির্যাতনে বাধা না দেয়ার ২৩টি এবং নির্যাতন সংক্রান্ত ১টি অভিযোগ।
পাঁচ অভিযোগের সবগুলোই প্রমাণিত:
একাত্তরে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধকালের পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে সবগুলোই প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ৬টি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে একাত্তরের ৪ ও ৬ এপ্রিল অবরুদ্ধ বাংলাদেশের সামরিক আইন প্রশাসক জেনারেল টিক্কা খানের সঙ্গে বৈঠক, ১৯ জুন ও ১ ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বৈঠক। এই ষড়যন্ত্রের দায়ে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের পরিকল্পনার অভিযোগে তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। পরিকল্পনার অভিযোগের মধ্যে রয়েছে ৪ এপ্রিল টিক্কা খানের সঙ্গে বৈঠক, যার ধারাবাহিকতায় ৯ এপ্রিল ঢাকায় ১৪০ সদস্যের নাগরিক শান্তি কমিটি গঠন এবং ৪ মে শান্তি কমিটির সভা।
গোলাম আযমের বিরুদ্ধে গঠিত তৃতীয় অভিযোগ উস্কানি। এই অভিযোগের দায়ে তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে উস্কানির ২৮টি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে ৭ এপ্রিল স্বাধীনতাকামী মানুষকে ‘ভারতীয় অনুপ্রবেশকারী’ উল্লেখ করে
গোলাম আযমের যুক্ত বিবৃতি; ১৭ মে ঢাকায় এক সভায় স্বাধীনতা আন্দোলনকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ‘বিশ্বাসঘাতক উল্লেখ করে বক্তব্য; ১৬ জুলাই রাজশাহী, ১৮ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ৪ আগস্ট খুলনা, ৭ আগস্ট কুষ্টিয়াসহ অনেক এলাকায় বিভিন্ন সভায় মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে উস্কানিমূলক বক্তব্য প্রভৃতি।
মানবতাবিরোধী অপরাধে সহযোগিতা বা সম্পৃক্ততার ২৩টি ঘটনা দিয়ে গোলাম আযমের বিরুদ্ধে চতুর্থ অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে ১৮ জুন লাহোর বিমানবন্দরে বক্তব্য, ১৯ জুন রাওয়ালপিন্ডিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বৈঠক এবং ২০ জুন লাহোরে সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য। এই অভিযোগে তাকে ২০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
গোলাম আযমের বিরুদ্ধে হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ একটি। এ অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২১ নভেম্বর তার লেখা চিঠির নির্দেশ অনুসারে ঢাকার মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সিরু মিয়া তার ছেলে আনোয়ার কামালসহ ৩৮ জনকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গুলি করে হত্যা করে রাজাকার ও আলবদররা। এ অভিযোগের দায়ে গোলাম আযমকে ৩০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গোলাম আযমের রায় হলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ৫ম রায়। এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ ও ২ থেকে ৪টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়।
এর আগে গতকাল রোববার সকাল পৌনে ১১টার দিকে এ রায়ের তারিখ ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল।
স্বাধীনতার ৪১ বছর পর একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হলে ওইসময় ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানের পক্ষ নেয়া ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা নস্যাৎ করতে রক্তের হোলিখেলায় মেতে ওঠা জামাতের সাবেক এ আমির গোলাম আযমের বিরুদ্ধে তদন্ত হয়।
তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন, রাষ্ট্রপক্ষের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আর আনুসঙ্গিক দলিল প্রমাণে তার বিরুদ্ধে ওই বছরের ১৩ মে অভিযোগ গঠন করে ট্রাইব্যুনাল।
এতে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের পরিকল্পনা, উষ্কানি, ষড়যন্ত্র, হত্যা নির্যাতন আর সম্পৃক্ততার অপরাধের ৬১টি ঘটনায় অভিযোগ গঠন করা হয়।
এর আগে গত বছরের ৯ জানুয়ারি তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের দেয়া আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল।
গত ১ জুলাই সাক্ষ্যগ্রহণের মধ্য দিয়ে বিচার শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষে ১৭ জন সাক্ষ্য দেন আর আসামিপক্ষে গোলাম আযমের ছেলে তিন মাস ধরে সাক্ষ্য দেন।
গত ১৭ এপ্রিল রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের যুক্তি খণ্ডনের মধ্যে এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়। ওই দিন রায় অপেক্ষমান রেখে ট্রাইব্যুনাল যে কোনো দিন রায় ঘোষণার কথা জানায়।
এ বছরের জানুয়ারিতে ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে জামাতের সাবেক সদস্য (রুকন) পলাতক আবুল কালাম আযাদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়। একই ট্রাইব্যুনাল থেকে জামাতের আরেক সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়।
ট্রাইব্যুনাল-১-এর প্রথম রায় ও ৩য় রায়ে জামাতের নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া হয়। সবশেষ ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে জামাতের আরেক সহকারি সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়।
উল্লেখ্য, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গত বছরের ১১ জানুয়ারি গোলাম আযমকে ট্রাইব্যুনালের নির্দেশে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়।
কারাগার থেকে চিকিৎসার জন্য তাকে নেয়া হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিজন সেলে।