জামাত নেতা মীর কাসেম আলীর যুদ্ধাপরাধ মামলার রায় রোববার ঘোষণার দিন ঠিক করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এটি হবে যুদ্ধাপরাধের ১২তম মামলার রায়। বৃহস্পতিবার বিচারপতি মুজিবুর রহমান মিয়ার নেতৃত্বে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল দুই সদস্যের বেঞ্চ এ দিন ঠিক করেছে।
তার জন্ম ও রাজনীতি নিয়ে কিছু কথা:
মানিকগঞ্জের হরিরামপুর থানার চালা গ্রামের পি ডব্লিউ ডি কর্মচারী তৈয়ব আলীর চার ছেলের মধ্যে দ্বিতীয় মীর কাসেম। তার ডাক নাম পিয়ারু হলেও স্থানীয়ভাবে সবাই চিনে মিন্টু নামে। পরে তিনি মীর কাশেম আলী নামে পরিচিত লাভ করেন।
রাজনীতিতে পথচলা:
১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ছাত্রসংঘ নাম বদলে ইসলামী ছাত্রশিবির নামে বাংলাদেশে রাজনীতি শুরু করলে মীর কাসেম আলী তার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হন। জামাতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলী দলটির অন্যতম প্রধান অর্থ জোগানদাতা হিসেবে পরিচিত। তিনি ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক, ইবনে সিনা ট্রাস্টের সদস্য (প্রশাসন) এবং কেয়ারি হাউজিং ও ইডেন শিপিং লাইন্সের চেয়ারম্যান। তিনি রাবেতা আলম আল ইসলামীর পরিচালক।
তার বিরুদ্ধে যতো অভিযোগ:
একাত্তরে মীর কাসেম আলী ইসলামী ছাত্রসংঘের চট্টগ্রাম অঞ্চলের সভাপতি ছিলেন। তার প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় চট্টগ্রামে হত্যা, নির্যাতন, অপহরণসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়। তার নেতৃত্বে আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী হত্যাযজ্ঞ চালায়। তার বিরুদ্ধে ১৪টি অভিযোগের মধ্যে চট্টগ্রামের আসাদনগর ও পাঁচলাইশ এলাকায় হত্যা এবং ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী বিভিন্ন ঘটনার অভিযোগ রয়েছে।
এসব ঘটনার সঙ্গে মীর কাসেম আলী নিজে ও তার নেতৃত্বাধীন আলবদর বাহিনী জড়িত। বিশেষ করে মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী চট্টগ্রাম শহরের দোস্ত মোহাম্মদ পাঞ্জাবি বিল্ডিং (চামড়ার গুদাম), সালমা মঞ্জিল, মহামায়া (ডালিম) হোটেলকে নির্যাতন কেন্দ্রে পরিণত করা হয় এবং সেখানে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নিরীহ ও নিরস্ত্র বাঙালিকে ধরে এনে নির্যাতনের পর হত্যা করা হতো।
মীর কাসেম স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম কলেজে পদার্থবিজ্ঞানের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। ওই সময় তিনি চট্টগ্রাম কলেজ শাখা ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি চট্টগ্রাম শহর শাখারও সভাপতি ছিলেন। পরে ১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের প্রাদেশিক কার্যকরী পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সাধারণ সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত হন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মীর কাসেম জামাতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সহযোগিতায় ইসলামী ছাত্রসংঘের বাছাই করা সদস্যদের সমন্বয়ে সশস্ত্র আলবদর বাহিনী গঠন করেন। সেই আলবদর বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে মীর কাসেম স্বাধীনতাবিরোধী মূল ধারার সঙ্গে একাত্ম হয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেন।
তার বিচার নিয়ে তথ্য:
চলতি বছরের ৪ মে বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে ট্রাইব্যুনাল-২ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে জামাতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেমের মামলার রায় অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, নির্যাতন, অপহরণ, গুম ও আটকসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৪টি ঘটনায় ট্রাইব্যুনাল আইনের ৩(২) ৪ (১ ও ২) ধারায় তার বিরুদ্ধে গত বছর ৫ সেপ্টেম্বর চার্জগঠন করে ট্রাইব্যুনাল। ৩০ সেপ্টেম্বর কাসেম আলীর মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ২ এ স্থানান্তর করা হয়। এরপর ১৮ ডিসেম্বর সূচনা বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়।
কাসেম আলীর বিরুদ্ধে ১৪টি অভিযোগের মধ্যে ১২টি অভিযোগের বিষয়ে প্রসিকিউশন আইনি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে। ১ ও ৫ নম্বর অভিযোগে সাক্ষী না থাকায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেনি প্রসিকিউশন। গত বছরের ১১ ডিসেম্বর থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত কাসেম আলীর বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তাসহ ২৪ জন সাক্ষ্য দেন। অন্যদিকে আসামিপক্ষে সাফাই সাক্ষী দেন ৩ জন।
এর আগে ২০১২ সালের ১৭ জুন কাসেম আলীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর ওইদিন বিকেলে মতিঝিলের দৈনিক নয়া দিগন্ত কার্যালয় (দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশন) থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।