মানবতাবিরোধী অপরাধে আলবদর কমান্ডার আলী আহসান মুজাহিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে আপিলে শুনানি বুধবার শেষ— রায় দেয়ার দিন ১৬ জুন ঠিক করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
এর আগে মঙ্গলবার বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চে যুক্তিতর্ক চলে। রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ইসলামী ছাত্রসংঘের নেতা মুজাহিদ আলবদর বাহিনীর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন। কিন্তু অক্টোবরের দিকে প্রধানের দায়িত্ব পায়। আর মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বাঙালি হত্যার হোলিখেলায় মেতে ওঠেন তিনি।
ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগের মামলায় ২০১০ সালের ২৯ জুন আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওই বছরের ২ আগস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তের পর তার বিরুদ্ধে ৬ ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধের সুনির্দিষ্ট ৭টি ঘটনায় অভিযোগ দায়ের করা হয়।
অভিযোগগুলো হলো:
১) একাত্তরের ১০ ডিসেম্বর চামেলীবাগ থেকে ইত্তেফাকের নির্বাহী সম্পাদক সিরাজ উদ্দিন হোসেনকে অপহরণ করা হয়। মুজাহিদের পরিচালনাধীন ও নিয়ন্ত্রণাধীন ৭/৮ জন যুবক তাকে ধরে মিনিবাসে তুলে নেয়। তারপর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি তার।
২) একাত্তরের মে মাসে মুজাহিদের নেতৃত্বে ফরিদপুর জেলার চরভদ্রাসন থানায় বিভিন্ন গ্রামে হিন্দুদের প্রায় ৩৫০টি বাড়ি পুড়িয়ে দেয় পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা। পরে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ে ৫০ থেকে ৬০ জন হিন্দু নরনারীকে হত্যা করে।
৩) একাত্তরের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে ফরিদপুর শহরের খাবাসপুর মসজিদের সামনে থেকে রাজাকাররা ফরিদপুর জেলার কোতোয়ালি থানার গোয়ালচামট (রথখোলার) মৃত রমেশ চন্দ্র নাথের পুত্র রণজিৎ নাথ ওরফে বাবু নাথকে আটক করে। পরে মুজাহিদের সহযোগিতায় বাবু নাথের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়।
৪) একাত্তরের ২৬ জুলাই সকালে ফরিদপুর জেলার আলফাডাঙ্গা থেকে স্থানীয় রাজাকাররা মো. আবু ইউসুফ ওরফে পাখিকে মুক্তিযোদ্ধা সন্দেহে আটক করা হয়। এরপর তাকে ফরিদপুর স্টেডিয়ামে আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে আটক করে নির্যাতন করা হয়।
৫) ১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট রাত ৮টায় পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সেক্রেটারি আসামি মুজাহিদ পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি মতিউর রহমান নিজামীসহ ঢাকার নাখালপাড়ার পুরনো এমপি হোস্টেলের আর্মি ক্যাম্পে যান। সেখানে তারা আটক সুরকার আলতাফ মাহমুদ, জহির উদ্দিন জালাল, বদি, রুমি, জুয়েল এবং আজাদকে দেখে তাদের গালিগালাজ করেন এবং পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনকে বলেন যে প্রেসিডেন্টের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আদেশের আগেই তাদের হত্যা করতে হবে।
ওই সময় একজনকে ছাড়া বাকিদের অমানুষিক নির্যাতনের পর হত্যা করে তাদের মৃতদেহ গুম করা হয়।
৬) একাত্তরের ২৭ মার্চের পর ঢাকার মোহাম্মদপুর ফিজিকেল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনী ক্যাম্প তৈরি করে। পরবর্তীতে রাজাকার ও আলবদর বাহিনী প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তারাও ওই স্থানে ক্যাম্প করে প্রশিক্ষণ গ্রহণসহ অপরাধজনক নানা কর্মকাণ্ড চালায়।
৭) একাত্তরের ১৩ মে মুজাহিদের নির্দেশে রাজাকার বাহিনী ফরিদপুরের কোতোয়ালি থানার বকচর গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর আক্রমণ করে। ওই সময় বিরেন্দ্র সাহা, উপেন সাহা, জগবন্ধু মিস্ত্রি, সত্য রঞ্জন দাশ, নিরোদ বন্ধু মিত্র, প্রফুল্ল মিত্র এবং উপেন সাহাকে আটক করা হয়। আর রাজাকাররা সুনীল কুমার সাহার কন্যা ঝুমা রানীকে ধর্ষণ করে। পরে আটক হিন্দু নাগরিকদের হত্যা করা হয়। আর অনিল সাহাকে দেশ ত্যাগে বাধ্য করা হয়।
এসব অভিযোগ প্রমাণে তদন্ত কর্মকর্তাসহ তার বিরুদ্ধে ১৭ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। আর তার পক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন একজন। গত ৪ জুন মুজাহিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামিপক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়েছে। আর ৫ জুন রাষ্ট্রপক্ষ যুক্তি খণ্ডন শেষ করে। এরপর থেকে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমান রাখে ট্রাইব্যুনাল। এক মাস ১০ দিন যাবতীয় প্রস্তুতি শেষে মঙ্গলবার মুজাহিদের মামলার রায় ঘোষণার তারিখ জানানো হয়েছে।