রাজধানীর গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলাকারী আরেকজনের পরিচয় পাওয়া গেছে।
তার নাম শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বল (২৫)— বাড়ি বগুড়ার ধুনট উপজেলার ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়নের কৈয়াগাড়ি গ্রামে। এ নিয়ে পাঁচ জনের পরিচয় জানা গেছে।
গতকাল চার জনের পরিচয় পাওয়া যায়। তাদের মধ্যে দুজন দীর্ঘ সময় নিখোঁজ ছিল—পরিবার থানায় জিডিও করেছিল। এ পাঁচজনের ছবি প্রকাশ করে আইএস দাবি করেছে, তারাই হামলা ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে।
গত শনিবার আই্এসপিআরের সংবাদ সম্মেলনে, ভোরে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ অভিযানে নিহত হন ছয় জন—তাদের সবাইকে হামলাকারী বলে উল্লেখ করা হয়। অভিযানের সময় একজনকে আটক করা হলেও এখনো তার পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
এদিকে, রাতে পুলিশের পক্ষ থেকে ছবি প্রকাশ করা হয় পাঁচ হামলাকারীর মরদেহের। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডিএমপি নিহত পাঁচ জঙ্গির মৃতদেহের ছবি এবং তাদের সংক্ষিপ্ত নামগুলো প্রকাশ করে।
নামগুলো হলো- আকাশ, বিকাশ, ডন, বাধন ও রিপন। তবে মৃতদেহগুলোর কোনটি কার সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেয়া হয়নি। এর আগে ইসলামিক স্টেটের পক্ষ থেকে জিহাদিদের যেসব ছবি ছাড়া হয়েছে তাদের সংখ্যাও ছিল ৫।
এ গরমিলের বিষয়ে জানতে চাইলে সরকারের কাছ থেকে স্পষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নিহত শফিকুল ইসলামের পরিবারের দাবি, ছয় মাস আগে সর্বশেষ বাড়ি এসেছিলেন তিনি। দীর্ঘদিনের জন্য ‘তাবলিগের চিল্লায় যাচ্ছি’ বলে বাড়ি থেকে বিদায় নেন। এরপর আর বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি তিনি।
শনিবার সকালে জিম্মি উদ্ধার অভিযানের পর হামলাকারী হিসেবে যে পাঁচটি লাশের ছবি পুলিশ গণমাধ্যমকে দিয়েছিল, তাদের মধ্যে শফিকুলের ছবিও ছিল। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস (ইসলামিক স্টেট) হামলার দায় স্বীকার করে হামলাকারী হিসেবে যে পাঁচজনের ছবি প্রচার করেছে, তাতেও শফিকুলের ছবি ছিল। আইএস দাবি করেছে, এরা তাদের সদস্য।
গতকাল বিকেলে এএসপি গাজিউর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল শফিকুলের বাড়ি যান।
পরিবারের সদস্যরা পুলিশকে জানান, শফিকুল ঢাকার আশুলিয়ায় চাকরি করেন, সেখানে আছেন। পরে ঘরের ভেতর বাঁধানো ছবির সঙ্গে পুলিশ তাদের কাছে থাকা ছবি মিলিয়ে দেখে। একপর্যায়ে শফিকুলের মরদেহের ছবি দেখে তার বাবা ও বড় ভাই তাকে তাকে শনাক্ত করেন। এরপর বাবা ও ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ধুনট থানায় নিয়ে আসে পুলিশ।
রাতে এএসপি গাজিউর রহমান বলেন, শফিকুলের বাবা ও ভাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
শফিকুলের বাবা বদিউজ্জামান (৫৫) ও বড় ভাই আসাদুল ইসলাম (৩২) দুজনই কৃষিশ্রমিক।
শফিকুলের ভাই আসাদুল ইসলাম বলেন, তার ভাই ধুনটের গোঁসাইবাড়ি উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও গোসাইবাড়ি ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজে ভর্তি হন। পরে পড়ালেখা বাদ দিয়ে বছর দুয়েক আগে তিনি ঢাকার আশুলিয়ায় একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতার চাকরি নেন। সর্বশেষ ডিসেম্বর শফিকুল বাড়িতে আসেন। তারপর তাবলিগ জামাতের চিল্লায় যাচ্ছেন বলে বাড়ি থেকে বিদায় নেন। এরপর শফিকুল আর বাড়ির কারও সঙ্গে যোগাযোগ রাখেননি।
গতকাল চার জনের পরিচয় পাওয়া যায়:
যে চারজনের পরিচয় পাওয়া গেছে তারা হলেন: ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, স্কলাসটিকা থেকে ও লেভেল পাস করা মীর সামেহ মোবাশ্বের, মালয়েশিয়ার মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নিবরাস ইসলাম ও বগুড়ার একটি মাদ্রাসার ছাত্র খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল। নিবরাস ইসলাম আগে ঢাকার টার্কিশ হোপ স্কুল ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন।
পুলিশ বলছে, বগুড়ার খায়রুলই গুলশানে হামলার নেতৃত্বে ছিলেন— তিনি এর আগে উত্তরবঙ্গে অন্তত তিনটি হত্যায় জড়িত ছিলে।
অভিযানে নিহত রোহান ইবনে ইমতিয়াজের বাবা ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা।
আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস নিহত পাঁচ জনকে তাদের সদস্য বলে দাবি করলেও বিষয়টি নাকচ করে দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি গতকাল রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে সাংবাদিকদের বলেন, এরা সবাই বাংলাদেশি, দেশে বেড়ে ওঠা। দেশের লোকজনের পরামর্শেই তারা কাজ করছে। বিদেশিদের সঙ্গে এদের যোগাযোগ আছে বলে মনে হয় না।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, এখন তারা মনে করছেন, আইএসের কথিত বার্তা সংস্থা আমাক নিউজের বরাত দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইট ইন্টেলিজেন্স যে পাঁচজনের ছবি দিয়েছে, তারাই মূলত হামলায় অংশ নিয়েছিলেন। তারা সবাই অভিযানে নিহত হন। এই পাঁচ জনের মধ্যে বগুড়ার খায়রুলকে ছয়-সাত মাস ধরে পুলিশ খুঁজছিল। বাকিদের সম্পর্কে কোনো ধারণা ছিল না তাদের।
রোহান: অভিযানে নিহত রোহান ইবনে ইমতিয়াজের বাবা এস এম ইমতিয়াজ খান ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের উপমহাসচিব ও সাইক্লিং ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক। রোহানের মা শিক্ষিকা। দুই ভাইবোনের মধ্যে রোহান বড়। তিনি ঢাকার স্কলাসটিকা থেকে এ লেভেল শেষ করে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত।
রোহানের খালা জেসমিন আক্তার সাংবাদিকদের বলেন, গত ৩০ ডিসেম্বর থেকে রোহান নিখোঁজ ছিল। তার সন্ধান চেয়ে পুলিশ, র্যা ব এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছেও গিয়েছি কেউ তার সন্ধান দিতে পারেনি।
মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জামাল উদ্দীন মীর বলেন, রোহান নিখোঁজ হন উল্লেখ করে গত ৪ জানুয়ারি থানায় জিডি করা হয়েছিল। জিডিতে বলা হয়, ৩০ ডিসেম্বর বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে রোহান আর বাসায় ফেরেনি। পরে তদন্তে দেখা যায়, রোহান জঙ্গি কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়েছেন। এরপর তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলে, যাতে দেশের বাইরে না যেতে পারেন, সে জন্য বিমানবন্দরেও জানানো হয়েছিল।
মোবাশ্বের: গত ২৯ ফেব্রুয়ারি কোচিংয়ে যাওয়ার কথা বলে মীর সামেহ মোবাশ্বের বনানীর ডিওএইচএসের বাসা থেকে বের হয়ে আর ফেরেননি। গতকাল ওই বাসায় তার বাবা মীর এ হায়াৎ কবিরের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, সামেহ স্কলাস্টিকা স্কুল থেকে ও লেভেল পাস করেছে। এ লেভেল পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। যেদিন সামেহ নিখোঁজ হয়, সেদিন তার গুলশানের আজাদ মসজিদের পাশের একটি কোচিং সেন্টারে যাওয়ার কথা ছিল। বাবা মীর এ হায়াৎ কবির একটি টেলিকম প্রতিষ্ঠানে উচ্চ পদে চাকরি করেন। মা একটি কলেজের সহযোগী অধ্যাপক।
হায়াৎ কবির বলেন, ‘মোবাশ্বের বোধবুদ্ধিতে কিছুটা পিছিয়ে ছিল। আমার মন বলছিল ও কারও খপ্পরে পড়েছে। আমরা সচেতন অভিভাবক ছিলাম। তারপরও আমার সুরক্ষিত বাড়ি থেকে বাচ্চাকে কেড়ে নিল। ওরা কত শক্তিশালী যে কেউ ধরতে পারছে না? আজ আমারটা নিয়েছে, কাল আর কারও কপাল আমার মতো হবে। এটা তো একটা জাতীয় দুর্যোগ।’ তিনি বলেন, ‘মোবাশ্বের নিখোঁজ হওয়ার পরে সেখানকার ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, গুলশানের আগোরার পাশে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে সে একটি রিকশায় করে বনানী ১১ নম্বরের দিকে যাচ্ছে। এরপর মুঠোফোনে বা অন্য কোনো মাধ্যমে সে পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।’
হায়াৎ কবির বলেন, পত্রপত্রিকায় যে ছবি ছাপা হয়েছে, তার সঙ্গে ছেলের চেহারা মেলে। নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথমেই তিনি গুলশান থানায় জিডি করেন। এরপর ডিবি, র্যা ব ও অন্যান্য সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। সংস্থাগুলো তাকে জানিয়েছে, যেদিন মোবাশ্বের নিখোঁজ হয়েছেন তার দু-এক দিনের মধ্যে গুলশান-বনানী এলাকা থেকে আরও চার-পাঁচটি ছেলে নিখোঁজ হয়। মোবাশ্বেরের কম্পিউটারে জঙ্গিবাদী গোষ্ঠীর কিছু যোগাযোগের তথ্য-প্রমাণ পায় তারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো সংস্থাই তাকে খুঁজে বের করতে পারেনি। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলেন, তাদের ধারণা ছিল, মোবাশ্বের দেশের বাইরে কোথাও চলে গেছেন। যদিও তার পাসপোর্ট বাসাতেই ছিল।
নিবরাস: মোনাশ বিশ্ববিদ্যালয়ের মালয়েশিয়া ক্যাম্পাসের ছাত্র ছিলেন নিবরাস ইসলাম। ব্যবসায়ী নজরুল ইসলামের এক ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে নিবরাস বড়। বাসা ঢাকার উত্তরায়। তার নিকটাত্মীয়রা সরকারের বিভিন্ন উচ্চ পদে চাকরি করেন। পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, নিবরাস যে মালয়েশিয়া থেকে ঢাকায় এসেছিলেন, তা-ই জানত না পরিবার।
খায়রুল: পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ছয়-সাত মাস ধরে উত্তরবঙ্গের অন্তত তিনটি হত্যাকাণ্ডে খায়রুল ইসলামের নাম এসেছে। তাকে তখন থেকেই খোঁজা হচ্ছিল। খায়রুল যে গুলশানে হামলার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, এ ব্যাপারে পুলিশ মোটামুটি নিশ্চিত।
বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার চুতিনগর ইউনিয়নের ব্রিকুষ্টিয়া গ্রামের দিনমজুর আবু হোসেনের দুই মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে খায়রুল বড়। ব্রিকুষ্টিয়া দারুল হাদিস সালাদিয়া কওমি মাদ্রাসায় কিছুদিন পড়েছিলেন খায়রুল। এরপর ডিহিগ্রাম ডিইউ সেন্ট্রাল ফাজিল মাদ্রাসা থেকে তিনি দাখিল পাস করে বলে প্রতিবেশীরা জানান।
খায়রুলের মা পেয়ারা বেগম বলেন, এক বছর ধরে খায়রুল নিখোঁজ ছিল। স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে হারানো বিজ্ঞপ্তি দেয়ার জন্য আট-নয় মাস আগে গিয়েছিলেন বাবা-মা। কিন্তু থানায় জিডি করতে হবে শুনে তারা আর বিজ্ঞপ্তি দেননি।
চুতিনগর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শাহজাহান আলী বলেন, গণমাধ্যমে ছবি দেখেই বাবা-মা ও প্রতিবেশীরা খায়রুলকে চিনতে পারেন। গ্রামে জানাজানি হয়। গতকাল বিকেলে পুলিশ একটি ছবি নিয়ে বাড়িতে আসে। তার বাবা-মা প্রথমে ছবিটি চিনতে পারছেন না বলে পুলিশকে জানান। পরে পুলিশ কর্মকর্তারা খায়রুলের ছবি দেখতে চাইলে বিষয়টি বেরিয়ে আসে। পুলিশ খায়রুলের মা-বাবাকে আটক করেছে।
ঢাকা মহানগর ডিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, ঢাকার অভিজাত এলাকায় বসে কেউ একজন এই হামলার সমন্বয় ও পরিকল্পনা করেছেন বলে তারা মনে করছেন। যার কারণে বগুড়ার নিম্নবিত্ত পরিবারের একজন মাদ্রাসাছাত্রের সঙ্গে ঢাকার অভিজাত পরিবারের চারটি ছেলের যোগাযোগ সম্ভব হয়েছে।
প্রসঙ্গত: গত শুক্রবার রাত পৌনে নয়টার দিকে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হত্যাযজ্ঞ চালায় জঙ্গিরা। ১২ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর জিম্মি সংকটের রক্তাক্ত অবসান ঘটে শনিবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে সেনা নেতৃত্বাধীন সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে। অভিযান শেষে ঘটনাস্থল থেকে ২০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়, যাদের জঙ্গিরা আগেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করেছিল। এই ২০ জনের মধ্যে ১৭ জন বিদেশি নাগরিক ও ৩ জন বাংলাদেশি। উদ্ধার অভিযানে নিহত হয় আরও ছয় জন। এর আগে শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রথম দফা উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তা। আহত হন অন্তত ৪০ জন। কৃতজ্ঞাতায় প্রথম আলো।