আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিখোঁজ তালিকায় থাকা ১৫ জনের তত্ত্ব-তালাশ করছেন গোয়েন্দারা। তারা দেশে বা দেশের বাইরের জঙ্গি-জালে জড়িয়ে আছেন এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার তদন্ত-অনুসন্ধানে থাকা গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস-এর সঙ্গেও তাদের কোনো না কোনোভাবে যোগাযোগ রয়েছে। একের পর এক টার্গেট কিলিং ও জঙ্গি হামলার চক্রান্ত, ক্যাডার নিয়োগ, মদদ বা অর্থ সরবরাহেও এদের যোগ থাকতে পারে।
এর মধ্যে ঘুরে ফিরে আসছে তিন নাম- তামিম আহমেদ চৌধুরী, সাইফুল্লাহ ওজাকি ও এটিএম তাজউদ্দিন। গোয়েন্দারা ব্যস্ত আছেন এদের রাজনৈতিক ও আর্থিক মদদের উৎস সন্ধানে।
রাজধানীর গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার শেকড় খুঁজতে এখনো গলদঘর্ম আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জঙ্গি তৎপরতার উৎস দেশের ভেতরে না বাইরে তা নিয়েও চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। কিন্তু কোনো উপসংহার টানা যাচ্ছে না সেজন্য তদন্ত-অনুসন্ধান, গ্রেপ্তার-আটক নিয়েও কেউ কিছু খোলাসা করছেন না।
গুলশানে হামলাকারী পাঁচ জঙ্গিই কমান্ডো অভিযানে মারা গেছে। শোলাকিয়ার হামলাকারীদের মধ্যেও দুজন পুলিশের অভিযানে নিহত হয়েছে। এ দু'ঘটনায় গ্রেপ্তার ও আটক সন্দেহভাজনরা জিজ্ঞাসাবাদের মধ্যে থাকলেও সব তথ্য তদন্তকারীরা খোলাসা করছেন না।
দেশে এ যাবত কালের মধ্যে নজিরবিহীন এই জঙ্গি হামলার তদন্ত করছে নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় থাকা সব বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ তদন্ত টিম। জঙ্গি দমনে প্রতিদিন অভিযানও চলছে কিন্তু হামলাকারী জঙ্গিদের নেপথ্যের চক্রান্তকারী, মদদ-অর্থ ও আশ্রয়ের হোতাদের কুল-কিনারা করা যায়নি।
এর মধ্যে নিখোঁজ তালিকায় উঠে আসা ভয়াবহ সব জঙ্গি-তথ্য নিয়ে নাড়াচাড়া করছেন গোয়েন্দারা। তালিকায় থাকা অনেকের জঙ্গি-ভিত্তি এতো শক্তিশালী, যাদের কারো কারো আইএস-এর সঙ্গে সরাসরি যোগ থাকার তথ্য রয়েছে। ইরাক-সিরিয়া-তুরস্ক বা অন্য যে দেশেই আশ্রয় হোক না কেন তাদের যোগসাজশ স্পষ্ট। গোয়েন্দারা ধারণা করছেন, এরাই বাইরে বসে নিয়ন্ত্রণ করছে বাংলাদেশের জঙ্গি তৎপরতা। যাদের সঙ্গে যোগ থাকছে হামলাকারীদেরও।
জাপানে থেকে আইএস-সংযোগে আসা সাইফুল্লাহ ওজাকি তেমনই একজন। তাকে বাংলাদেশের জঙ্গিদের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক বলেই ধারণা করছেন গোয়েন্দারা। ২০০১ সালে জাপানে গিয়ে ধর্মান্তরিত হয়ে এক জাপানির প্রভাবে সাইফুল্লাহ আইএস-জালে জড়িয়ে সিরিয়ায় পাড়ি জমাতে পেরেছেন কিনা তা স্পষ্ট নয়। সিরিয়ায় না থাকলেও তার অবস্থান তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া বা খোদ জাপানেই।
একইভাবে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী তাজউদ্দিনের জঙ্গি-সংযোগও এখন আলোচনায়। সর্বশেষ দেশে এসেছিলেন ২০১৩ সালে। তার স্ত্রী বিদেশি একজন ধর্মান্তরিত মুসলিম, তার অবস্থাও পারিবারিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
বাংলাদেশে জঙ্গিদের শীর্ষ মদদদাতা হিসেবে ধরা হয় কানাডীয় নাগরিক সিলেটের তামিম চৌধুরীকে। আইএসের মাধ্যমে তাকে আইএস-বাংলাদেশ শাখার প্রধান বলেও দাবি করা হয়। ২০১৩ সালে কানাডা ছাড়ার পর তার অবস্থান এখন লন্ডন বাংলাদেশ না ভারতে তা নিশ্চিত নয়। তবে জামাত-সংশ্লিষ্টতা থাকা পরিবারের সঙ্গে তার শেষ যোগাযোগ হয়েছিল ৫ বছর আগে।
আইএস-এর নামে ভিডিও বার্তায় হুমকি দেয়া তাহমিদ রহমান সাফি, তাউসিফ হোসেন ও ডা.আরাফাত হোসেন তুষারও রয়েছেন একই জঙ্গি-জালের মধ্যে।
গোয়েন্দা নজরদারিতে আছে শেহজাদ রউফ ওরফে অর্কের নামও। তবে ধারণা, তাউসিফ ও শেহজাদের বর্তমান অবস্থান এখনো দেশেই। জঙ্গি জিলানী ওরফে আবু জিন্দাল তালিকায় থাকলেও আইএস-মাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে, সিরিয়া যুদ্ধে তার মৃত্যু হয়েছে। এরকম নিহত আরেকজন সাইফুল হক ওরফে সুজন।
এভাবে আন্তর্জাতিক জঙ্গি-জালের মধ্যেই রয়েছে জুনুন শিকদার, বাসারুজ্জামান, জুবায়ের রহিম, আশরাফ মোহাম্মদ ইসলাম, জুনায়েদ খান, ইব্রাহীম হাসান খানের নামও।
আন্তর্জাতিক জঙ্গি-জাল আইএস-আলকায়েদার হলেও দেশে এরা তৎপর জেএমবি, এবিটি, হুজি বা হিযবুত তাহরির এসব নিষিদ্ধ সংগঠনের ভেতরেই। গোয়েন্দারা এখন কাজ করছেন জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক যোগাযোগ অনুসন্ধানের।