রাজধানীর আজিমপুরেল শনিবার রাতে পুলিশের অভিযানে সন্দেহভাজন এক জঙ্গি নিহত হয়েছেন—এ অভিযানে আহত তিন নারী ও শিশুদের উদ্ধার করা হয়েছে।
জানা গেছে, ওই বাসায় দুটি মেয়েশিশু এবং একটি ছেলেশিশুও ছিল। মেয়ে দুটির একটির বয়স ছয়-সাত বছর, আরেকটির বছর খানেক। ছেলেটির বয়স ১৩-১৪ বছর। তাদেরকে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ বলছে, শনিবার রাতের এ অভিযানে নিহত ওই ব্যক্তির নাম তেহজীব করিম তার সাংগঠনিক নাম আবদুল করিম। তার বাসা ধানমণ্ডির গ্রিন রোডে। তার আরেক ভাই রাজীব করিম তিন-চার বছর আগে ব্রিটেনে বিমানে বোমাহামলা চেষ্টায় গ্রেপ্তার হয়ে সেখানে জেল খাটছেন। তেহজীব করিমের শ্বশুর জঙ্গিদের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান 'আইসিইউডি'র সংগঠক।
পুলিশের প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে, রাজধানীর গুলশানে হলি আর্টিজানে হামলাকারী তরুণদের বাসা ভাড়া করে দিয়েছিলেন করিম। অভিযানে আহত তিন নারীর একজন মিরপুরের রূপনগরে পুলিশের অভিযানে নিহত মেজর (অব.) জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী জেবুন্নাহার শিলা।
গুলশান হামলার অন্যতম ‘সমন্বয়কারী’ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিক তামিম চৌধুরীর সঙ্গে জাহিদের ঘনিষ্ঠতা ছিল।
রাজধানীর মিরপুরে জাহিদুল নিহত হওয়ার আট দিনের মাথায় গতকাল রাতে আজিমপুরে পুলিশ এই অভিযান চালাল। ঢাকা মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট পরিচালিত অভিযানটি গত রাত পৌনে ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত চলে। অভিযান শেষে
ঘটনাস্থলে ছিল পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), র্যা ব ও জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা।
ঘটনাস্থল থেকে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক বলেন, ‘নিহত জঙ্গি আবদুল করিম হয়ে থাকতে পারেন। তিনি গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলাকারী তরুণদের বসুন্ধরার বাড়িটি ভাড়া করে দিয়েছিলেন। আমরা তার ছবি আগেই সংগ্রহ করেছি। ছবির সঙ্গে নিহত জঙ্গির চেহারায় মিল পাওয়া গেছে।’ এ অভিযানে পুলিশের ৫ সদস্য আহত হয়েছে।
এক প্রশ্নের জবাবে আইজি বলেন, আহত তিন নারী জঙ্গির একজন মেজর (অব.) জাহিদুলের স্ত্রী হয়ে থাকতে পারেন। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা শিশুদের মধ্যে তাদের সন্তান থাকতে পারে। তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কমিশনার শাহাবুদ্দীন কোরেশি বলেন, পুলিশ ওই বাড়িতে ঢোকার চেষ্টা করলে জঙ্গিরা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। এতে দুই পুলিশ সদস্য ছুরিকাহত হন। বাকি তিনজনের দিকে জঙ্গিরা মরিচের গুঁড়া ছুড়ে মারে। আহত পাঁচ পুলিশ কনস্টেবল হলেন লাভলু জামান, রাম চন্দ্র বিশ্বাস, শাহজাহান আলী, জহিরুদ্দীন ও মাহতাবউদ্দীন।
পুলিশ সূত্র জানায়, স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সহযোগিতায় রাত পৌনে আটটার দিকে পুলিশ আজিমপুরের ওই বাড়ির দোতলায় অভিযান চালায়। স্থানীয় ব্যক্তিরা বলেন, ওই বাড়ির মালিক মোহাম্মদ কায়সার। ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় তার মিষ্টির ব্যবসা আছে। এ মাসের ১ তারিখ দোতলার ওই বাসা ভাড়া দেন তিনি। অবশ্য এ বিষয়ে বাড়ির মালিকের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানিয়েছে, পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে বাসার বাসিন্দারা দরজা খুলে তাদের ওপর হামলা চালায়। তারা দুই পুলিশ সদস্যকে কুপিয়ে আহত করে। হামলাকারীদের মধ্যে একজন নারী ছোরা হাতে পালানোর চেষ্টা করেন। একদল পুলিশ ওই নারীর পিছু নেয়। পুলিশের অন্য সদস্যরা ওই বাসার ভেতর অভিযান অব্যাহত রাখেন। এ সময় পুলিশের গুলিতে আবদুল করিম নিহত হন। বাসায় থাকা অপর দুই নারী সদস্য ছুরি দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ আহত দুই নারীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়।
পুলিশ সূত্র জানায়, এদিকে বিডিআর ২ নম্বর গেটের দিকে পালিয়ে যেতে থাকা নারীকে ‘জঙ্গি’ বলে তাকে ধরতে এলাকাবাসীর সহায়তা চান পুলিশ সদস্যরা। পিছু নিয়ে প্রায় ১০০ গজ যাওয়ার পর তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে পুলিশ। এতে ওই নারী আহত হন। পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় ওই নারীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ঘটনার কিছুক্ষণ পর ওই বাসা থেকে একটি ছেলেশিশুকে পুলিশ গাড়িতে করে নিয়ে যায়। এরপর দুটি মেয়েশিশুকেও একইভাবে ওই বাসা থেকে নিয়ে যেতে দেখা যায়। এরপর পুলিশ বাড়িটি ঘিরে রাখে। বাড়ির তত্ত্বাবধায়ক মোবারককে পুলিশ রাত ১১টার দিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান বলেন, আহত তিন নারীর একজনের বুকের কাছে গুলি লেগেছে। অন্য দুজন ছুরিকাহত। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে তারা নিজেদের নাম শারমিন, খাদিজা ও শাহেলা।
উল্লেখ, গত ২৭ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের পাইকপাড়ায় একটি বাড়ির তিন তলার একটি ফ্ল্যাটে অভিযানে কানাডাপ্রবাসী তামিম চৌধুরী ও তার দুই সহযোগী নিহত হন। ২৬ জুলাই কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে নয় জন নিহত হন। সেখানে আহত অবস্থায় একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গত ১ জুলাই রাতে পাঁচ জঙ্গি গুলশান ২-এর ৭৯ নম্বর সড়কে হলি আর্টিজান বেকারি রেস্তোরাঁয় হামলা চালান। তারা দেশি-বিদেশি ২০ নাগরিককে নৃশংসভাবে হত্যা করেন। ওই রাতে অভিযান গিয়ে নিহত হন পুলিশের দুজন কর্মকর্তা। পরদিন সকালে সেনা অভিযানের মধ্য দিয়ে জঙ্গিদের ১২ ঘণ্টার জিম্মি সংকটের অবসান হয়। অভিযানে পাঁচ জঙ্গিসহ ছয়জন নিহত হন।