রংপুরের আইনজীবী (পিপি) রথীশচন্দ্র ভৌমিক বাবুসোনার মরদেহ উদ্ধার করেছে র্যাব।
রথীশচন্দ্র ভৌমিক বাবুসোনার স্ত্রী দীপা ভৌমিক ও দুই সহকর্মীকে গ্রেপ্তারের পর তাদের দেয়া তথ্যের উপর ভিত্তি করে মরদেহ উদ্ধার করেন তারা।
মঙ্গলবার মধ্যরাতে র্যাব রংপুর শহরে রথীশের বাড়ির আধা কিলোমিটার দূরে তাজহাট মোল্লাপাড়া এলাকার নির্মাণাধীন একটি বাড়ি থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
রথীশের ভাই সাংবাদিক সুশান্ত ভৌমিক সুবল তার ভাইয়ের মরদেহ শনাক্ত করেন সেখানে দীপাকেও নেয় র্যাব।
অভিযানে নেতৃত্ব দেয়া র্যাব-১৩ এর অধিনায়ক মেজর আরমিন রাব্বী বলেন, দীপার সঙ্গে তার এক সহকর্মী শিক্ষকের সম্পর্কের জের ধরে রথীশকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করা হচ্ছে।
যে বাড়িতে রথীশের মরদেহ পাওয়া গেছে, তা দীপার সহকর্মী তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলামের ভাইয়ের বাড়ি।
দীপাকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়ে মেজর রাব্বী সাংবাদিকদের বলেন, তার দেয়া তথ্যেই মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
র্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, চার-পাঁচ দিন আগে হত্যার পর মরদেহ নির্মাণাধীন বাড়িটিতে মাটিচাপা দেয়া হয়েছিল।
রংপুরের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, স্ত্রীর পরকীয়ার কারণে রথীশ চন্দ্র ভৌমিককে খুন করা হয়েছে— এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত ৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরো যারা জড়িত তাদের ধরতে অভিযান চলছে।
র্যাব ও পুলিশ জানায়, জাপানি নাগরিক হত্যা ও মাজারের খাদেম হত্যা মামলার পিপি ছিলেন রথীশ চন্দ্র ভৌমিক বাবু সোনা। গত শুক্রবার থেকে বাবু সোনার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয় বাবু সোনা নিখোঁজ, তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এরপর বিভিন্ন সংগঠন তাকে উদ্ধারে মানববন্ধন, সমাবেশ, অনশনসহ নানা কর্মসূচি পালন করে। এরপরই মাঠে নামে র্যা ব, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থাসহ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তারা প্রথমেই পরকীয়ার বিষয়টি মাথায় রেখে তদন্তে নামেন। এরপর পুলিশ বাবু সোনার স্ত্রী তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা স্নিগ্ধা ভৌমিক ও তার প্রেমিক একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলামের মোবাইল ফোনের কললিস্ট বের করে। কললিস্ট দেখে আঁতকে উঠেন পুলিশ। প্রতিদিন প্রেমিক-প্রেমিকা জুটি ৩০ থেকে ৩৫ বার মোবাইলে কথা বলতেন। ওই কললিস্ট দেখে সন্দেহ হলে শনিবার রাতে নগরীর রাধাবল্লভের বাড়ি থেকে প্রথমে গ্রেপ্তার করা হয় কামরুল ইসলামকে। তাকে ধরার পর জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। এরপর হত্যাকাণ্ডের তথ্য জানায় কামরুল।
তারা আরো জানায়, রথীশের স্ত্রী স্নিগ্ধা সরকার ও তার দুই সহকর্মীকে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গতকাল রাত সাড়ে আটটার দিকে অভিযানে নামে র্যা ব। আটক করা ব্যক্তিদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে লাশের সন্ধান মেলে।
সোমবার তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলাম ও মতিয়ার রহমানকে আটকের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।
তাজহাট উচ্চ বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ছিলেন রথীশ। তার স্ত্রী দীপা এই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বলে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তৌহিদা খাতুন জানান।
সোমবার সন্দেহভাজন নয় জনকে গ্রেপ্তারের পর কামরুল ও মতিয়ারকে আটক করা হলেও তখন কিছু জানায়নি পুলিশ। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় তাদের গ্রেপ্তারের কথা স্বীকার করেন কোতোয়ালি থানার ওসি বাবুল মিঞা।
তখন পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, যাদের আটক করা হয়েছে জিজ্ঞাসাবাদে তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।
এর মধ্যে দুপুর থেকে রথীশের বাড়ির পাশের ডোবাটিতে তল্লাশি শুরু করে পুলিশ। রথীশের চাচাত ভাই লিটন ভৌমিকের গোয়াল ঘরের পাশের আট-দশ ফুট গভীর এ ডোবায় তল্লাশি চালানো হয়।
সেখানে বিকালে আবর্জনার নিচে হালকা রক্তের ছিটা লাগানো সাদা একটি শার্ট পাওয়ার পর তা মাহিগঞ্জ পুলিশ ফাঁড়িতে নেয়া হয়।
রথীশের ছোট ভাই সুশান্ত তা দেখে বলেন, শার্টটিতে রক্তের ছিটার মতো লেগেছিল। তবে সেটি ভাইয়ের নয়।
রাতে ডোবায় তল্লাশি অভিযান পুলিশ স্থগিত রাখার খানিক পর তাজহাটে র্যা বের অভিযানে কামরুলের ভাইয়ের নির্মাণাধীন বাড়িতে একটি লাশ পাওয়ার খবর আসে। সেখানে নিয়ে যাওয়া হয় দীপাকেও। এরপর লাশ শনাক্ত করা হয়।
রথীশ নিখোঁজ হওয়ার পর সুশান্ত বাদী হয়ে কোতোয়ালি থানায় একটি মামলা করেন। তবে তাতে কাউকে আসামি করা হয়নি।
র্যা ব কর্মকর্তা রাব্বী সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নে বলেন, তারা তদন্ত শেষ করে এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানাবেন।
গত শুক্রবার সকালে তাজহাট বাবুপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন রথীশ। তাকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধারের দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালিত হয়। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপও কামনা করা হয়।
রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক রথীশ জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি এবং মাজারের খাদেম রহমত আলী হত্যা মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ছিলেন। হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি, জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন তিনি।
শুক্রবার সকাল ৬টার দিকে নগরীর বাবুপাড়া এলাকার বাড়ি থেকে বের হয়ে এক ব্যক্তির সঙ্গে মোটরসাইকেলে করে শহরের দিকে রওনা হয়েছিলেন রথীশ। এরপর থেকে আর বাড়ি ফেরেননি।
এ ঘটনার পর ট্রাস্টের নেতারা সন্দেহ প্রকাশ করেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে জামাতের কিংবা জঙ্গি গোষ্ঠী কিংবা ভূমিদস্যুরা রথীশকে ধরে নিয়ে যেতে পারে।
রংপুর আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক বলেন, আমার সহকর্মী বাবু সোনার হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের আমি দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই। যেন কেউ আর এ ধরনের ঘটনা ঘটাতে সাহস না পায়।
রংপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজু বলেন, বাবু সোনা জেলা আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। আমরা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দাবি জানাই এ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তারের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।