কোটা সংস্কার আন্দোলনে অংশ নেয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি সুফিয়া কামাল হলের ৩ ছাত্রীকে নির্যাতনের অভিযোগে হল শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইফাত জাহান এশাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার গভীর রাতের এ ঘটনায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন— রাতভর চলে উত্তেজনা। ছাত্রী নির্যাতনের খবর ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কবি সুফিয়া কামাল হলের সামনে এসে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এ ছাড়া ছাত্রী হল থেকে সাধারণ ছাত্রীরা বের হয়ে এসে বিক্ষোভ করেন। তারা ইফফাত জাহানকে বহিষ্কারের দাবিতে স্লোগান দেন। এমন উত্তেজক পরিস্থিতিতে হল শাখা ছাত্রলীগ সভাপতি ইফফাত জাহানকে বিশ্ববিদ্যালয় ও সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়ছে। গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি।
হলের সাধারণ ছাত্রীরা অভিযোগ করেন, মঙ্গলবার দিবাগত রাতে উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্রী মোর্শেদা আক্তারকে নিজের কক্ষে নিয়ে মারধর করেন ইফফাত জাহান। একপর্যায়ে মোর্শেদার পা কেটে যায়। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনে অংশ নেয়া ছাত্রীদের আন্দোলনের প্রথম দিন থেকেই কক্ষে নিয়ে মারধর করে আসছিলেন ইফফাত জাহান।
তবে নির্যাতনের শিকার ছাত্রীরা ভয়ে কাউকে কিছু বলেননি। কিন্তু মঙ্গলবার মধ্যরাতের ঘটনার পর হলের সাধারণ ছাত্রীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
ছাত্রী নির্যাতনের খবর পেয়ে রাত পৌনে ১টার দিকে বিশ্বিবদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক গোলাম রব্বানী হলে যান। রাত আড়াইটার দিকে প্রক্টর বেরিয়ে এসে নির্যাতনের অভিযোগে ছাত্রলীগ নেত্রী এশাকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা জানান। নির্যাতিত শিক্ষার্থীর চিকিৎসার ব্যবস্থাও তিনি করেন।
পরে রাতেই ব্রিফিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামান রাতে সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুঃখজনক। এটা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। আমি তাৎক্ষণিক প্রক্টরের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রক্টরের টিমকে ওখানে পাঠিয়েছি। হল প্রশাসনকে বলেছি, মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। তারপর আমি বিস্তারিত জেনেছি। আমি অবহিত হয়েছি— হলের ইফাত জাহান এশা আরেকটি মেয়েকে মেরেছে। যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। যার নিন্দা জানানোর ভাষা আমাদের নেই। হল প্রশাসনকে বলেছি, দোষী মেয়েটিকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করতে। আগামীকাল এর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হবে। কেউ যেন সীমালঙ্ঘন না করে। আইনহীনতা, বিচারহীনতা চলতে পারে না। সে যেই হোক, বিচার হবে।’
ইফাত জাহান এশাকে এর আগেও বহিষ্কার করা হয়েছিল এবং পুনরায় বহিষ্কারাদেশ প্রতাহ্যার করা হয়। এবারও কি সেরকম হবে কিনা সাংবাদিকরা জানতে চাইলে ভিসি বলেন, ‘আমরা সজাগ থাকবো, সেরকম যাতে না হয়। রাজনৈতিক পরিচয় যাই থাকুক, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
ঘটনার পর মধ্যরাতেই ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইফফাত জাহানকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের কথা জানানো হয়। এতে বলা হয়, শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে ইফফাত জাহানকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করা হবে।
ইফফাত জাহানকে বহিষ্কার করার খবর জানার পর হলের সামনে জড়ো হওয়া শিক্ষার্থীরা ভোররাত চারটার দিকে ফিরে যান।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী একাধিক ছাত্রী সাংবাদিকদের বলেন, গতকাল দিবাগত রাত ১২টার দিকে ইফফাত হলের তিন ছাত্রীকে একটি কক্ষে ডেকে নির্যাতন করেন। নির্যাতনের শিকার ছাত্রীদের চিৎকার শুনে সেখানে যান উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী মোর্শেদা খানম। কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে মোর্শেদা কক্ষের জানালার কাচে লাথি মারেন। এতে তার পা কেটে যায়।
ভিডিওতে মোর্শেদাকে বলতে শোনা যায়, দীর্ঘদিন ধরে তারা এ ধরনের নির্যাতন সহ্য করছেন। প্রশাসন তাদের আবাসনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা না করায় তারা হলের নেত্রীদের কথামতো চলতে বাধ্য হন। সবশেষ গত রোববারের আন্দোলনে পুলিশি হামলার প্রতিবাদে ছাত্রীরা রাত্রিবেলা হল থেকে বের হয়ে বিক্ষোভে যোগ দিয়েছিলেন। ওই দিন ও পরের দিন সোমবার আন্দোলনে যোগ দেওয়ায় বেশ কয়েকজনকে চড়-থাপ্পড় দেন ইফফাত। আজ (মঙ্গলবার) গিয়ে দেখেন, তিনজনকে মারধর করা হচ্ছে। তিনি আর নিজের ক্ষোভ সংবরণ করতে পারেননি। জানালায় লাথি দিয়ে তিনি প্রতিবাদ করেন।
মোর্শেদা ছাত্রলীগের সুফিয়া কামাল হল শাখার সহসভাপতি। তবে তিনি শুরু থেকেই কোটা সংস্কার আন্দোলনের পক্ষে। তাকে প্রথমে সরকারি কর্মচারী হাসপাতাল ও পরে বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা কেন্দ্রে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এ সময় তিনি গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। পরে তাঁকে মগবাজারে এক আত্মীয়ের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়।
খবর পেয়ে অন্য ছাত্রীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে ইফফাতকে মারধর করে তাকে আটকে রাখেন। ছাত্রী নির্যাতন করায় তার বহিষ্কারের দাবিতে বাইরে বিক্ষোভ করতে থাকেন অনেকে। ‘নির্যাতনকারীর কালো হাত, ভেঙে দাও গুঁড়িয়ে দাও’, ‘মরতে নয়, পড়তে চাই’, ‘বোনের ওপর হামলা কেন, প্রশাসন জবাব চাই’—এসব স্লোগান দিতে থাকেন তারা।
এ সময় আহত মোর্শেদা সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তার আত্মীয়ের বাসায় চলে যান। কবি সুফিয়া কামাল হলের সিনিয়র আবাসিক শিক্ষক শামীম বানু বলেন, ‘ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে আমরা সেখানে যাই। আহত শিক্ষার্থীকে সরকারি কর্মচারী হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর একটি অ্যাম্বুলেন্সে তাকে স্বজনের সঙ্গে বাসায় পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।’
মোরশেদাকে দেয়া চিকিৎসা সম্পর্কে সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের ইমারজেন্সির মেডিক্যাল অফিসার ডা. গালিব বলেন, ‘মোরশেদার পায়ের পেছনে ও সামনে কেটেছে। পেছনের কাটা একটু গভীর। ড্রেসিং করেছি, সেলাই লেগেছে।’