নোয়াখালীর সুবর্ণচরে ভোটের রাতে স্বামী-সন্তানকে বেঁধে গৃহবধূকে দলবেধে ধর্ষণের ঘটনায় আলোচিত আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা রুহুল আমিনসহ দুই জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ধর্ষণের শিকার ওই নারী অভিযোগ করেন, ভোটের সময় নৌকার সমর্থকদের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়েছিল। এরপর রাতে সুবর্ণচর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক রুহুল আমিনের ‘সাঙ্গপাঙ্গরা’ বাড়িতে গিয়ে স্বামী-সন্তানকে বেঁধে তাকে ধর্ষণ করে।
গতকাল পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক তাকে দেখতে যান। এ সময় ওই নারী তার কাছে অভিযোগ করেন চরজব্বার থানা পুলিশ মামলার এজাহার থেকে রুহুল আমিনের নাম বাদ দিয়েছে।
ডিআইজি গোলাম ফারুক ধর্ষণের ঘটনায় রুহুল আমিনের সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখার প্রতিশ্রুতি দেন।
গভীর রাতে দুজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
জেলার পুলিশ সুপার মো. ইলিয়াছ শরীফ বলেন, রুহুল আমিনকে গ্রেপ্তার করা হয় জেলা সদরের একটি হাঁস-মুরগীর খামার থেকে। আর সেনবাগের একটি ইটভাটা থেকে মামলার আসামি বেচুকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ নিয়ে মোট পাঁচজনকে এ মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সুবর্ণচরের আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন চর জুবলী ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য। আর বেচু (২৫) মধ্যম বাগ্যা গ্রামের আবুল কাশেমের ছেলে। এ মামলার এজাহারে বেচুর নাম রয়েছে পাঁচ নম্বরে।
এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে আগে তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তারা হলো: মো. স্বপন, মো. সোহেল ও বাদশা আলম ওরফে কুড়াইল্যা বাসু।
স্বপনকে গত মঙ্গলবার রাতে এবং সোহেলকে গতকাল গ্রেপ্তার করা হয়।
সোহেল এ মামলার প্রধান আসামি।
নির্যাতনের শিকার নারী গত রোববার সকালে এলাকার একটি ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে যান। এ সময় কেন্দ্রে থাকা আওয়ামী লীগের কয়েকজন যুবক তাকে তাদের পছন্দের প্রতীকে ভোট দিতে বলেন। তিনি তাতে রাজি না হলে যুবকেরা তাকে দেখে নেয়ার হুমকি দেন। ওই দিন রাত ১২টার দিকে ছালা উদ্দিন, সোহেল, বেচু, মোশারফসহ ১০ থেকে ১২ জনের একদল যুবক ঘরে ঢুকে প্রথমে স্বামী-স্ত্রী দুজনকে মারধর করেন। পরে স্বামী ও সন্তানদের বেঁধে রেখে ওই নারীকে ঘরের বাইরে পুকুরপাড়ে এনে গণধর্ষণ করেন।
নির্যাতনের শিকার নারীর অভিযোগ, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা সবাই চরজুবলী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য রুহুল আমিনের লোক।
মামলার এজাহারে মো. সোহেল (৩৫), মো. হানিফ ৩০), মো. স্বপন (৩৫), মো. চৌধুরী (২৫), মো. বেচু (২৫), বাদশা আলম ওরফে কুড়াইল্যা বাসু (৪০), আবুল (৪০), মোশারফ (৩৫) ও ছালা উদ্দিনের (৩৫) নাম উল্লেখ করা হয়।
নির্যাতিত নারী বলেন, তার সারা শরীরে নির্যাতনের স্থানে রক্ত জমে আছে। তিনি নড়াচড়া করতে পারছেন না।
নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মো. খলিল উল্যাহ বলেন, ডাক্তারি পরীক্ষাকালে নির্যাতনের শিকার শরীর থেকে সংগ্রহ করা আলামত পরীক্ষার জন্য গতকাল আবদুল মালেক উকিল মেডিকেল কলেজের সংশ্লিষ্ট বিভাগের বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানো হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রতিবেদন পাওয়া যেতে পারে।
চরজব্বার থানার ওসি নিজাম উদ্দিন বলেন, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া বাদশা আলম ও স্বপনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। কিন্তু তারা ঘটনার বিষয়ে কিছু স্বীকার করেননি। আদালতে বাদশা আলমের সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন জানানো হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, নোয়াখালীতে গৃহবধূ ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের কেউ ছাড় পাবে না। এ ধরনের ঘটনা অবশ্যই নিন্দনীয় ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ব্যাপারে সরকার কঠোর অবস্থানে আছে।
সুবর্ণচরে গৃহবধূকে ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সংগঠন। তারা এই ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে।
গতকাল জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) আল-মাহামুদ ফয়জুল কবিরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি দল এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সেলিনা আক্তারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের আরেকটি দলও ঘটনার তদন্তে নোয়াখালীতে যায়।