রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সম্পৃক্তার প্রমাণ পাওয়া গেছে—তদন্ত প্রতিবেদন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে জমা দিয়েছে এ বিষয়ে গঠিত কমিটি।
সোমবার তদন্ত কমিটির প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাস উদ্দিন অর্থমন্ত্রীর কাছে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেন।
এ সময় তিনি বলেন, রিজার্ভ চুরির ঘটনায় সুইফট দায় এড়াতে পারে না তেমনি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা সমান দায়ী—আগামী বাজেটের পর তা প্রকাশ করা হবে।
কমিটির প্রধান ফরাসউদ্দিন বলেন, আজ চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিলাম— নির্ধারিত ৭৫তম দিনেই জমা দিলাম। বাংলাদেশ ব্যাংককে ধন্যবাদ— তারা অনেক সহযোগিতা করেছে বলেই সময়মতো প্রতিবেদন জমা দিতে পেরেছি।
ফরাসউদ্দিন বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন থেকে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ৯০ শতাংশ পরিবর্তন এসেছে।
সাবেক এ গভর্নর বলেন, আমরা দেখেছি, কারা দায়ী, বাইরের কারা জড়িত, দেশের কারা জড়িত কতটা অর্থ আদায় করা সম্ভব, তারও একটা চিত্র প্রতিবেদনে দিয়েছি। বলা যায়, আশাব্যঞ্জক চিত্র।
ফরাসউদ্দিন বলেন, আমাদের প্রতিবেদনে যা কিছু এসেছে, তা নিয়ে এই সময়ে কথা বলা ঠিক হবে না।
অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনের সঙ্গে চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বড় ধরনের পার্থক্যের কারণ জানতে চাইলে ফরাসউদ্দিন বলেন, আগের প্রতিবেদন করার ক্ষেত্রে অনেক তাড়াহুড়া ছিল।
কমিটির প্রধান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির বিষয়ে সুইফটেরও দায়-দায়িত্ব আছে— তারা দায় এড়াতে পারে না ভবিষ্যতে এ বিষয়ক সমস্যার সমাধান তাদের নিয়েও করতে হবে।
তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পার অর্থমন্ত্রী বলেন, শিগগিরই জনসম্মুখে তা প্রকাশ করা হবে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, তিনি এখনো প্রতিবেদনটি পড়েননি— ২ জুন পর্যন্ত ব্যস্ত থাকবো তবে ১৫-২০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হবে এটাই প্রতিজ্ঞা।
মুহিত বলেন, কীভাবে এ ঘটনা (রিজার্ভের অর্থ চুরি) ঘটল এবং আমরা কী করতে পারি—দুটি বিষয়ই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
কমিটির কর্মপরিধির মধ্যে ছিল—বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে এই অর্থ কীভাবে ও কার বরাবর গেল, অবৈধ পরিশোধ ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক কী পদক্ষেপ নিয়েছে, বিষয়টি উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে গোপন রাখার যৌক্তিকতা কী, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না, অর্থ উদ্ধারের সম্ভাবনা কতটুকু, একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে করণীয় কী ইত্যাদি।
গত ২০ এপ্রিল কমিটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন জমা দেয়। আজ জমা দিল চূড়ান্ত প্রতিবেদন।
গত ১৫ মার্চ নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির অন্য দুজন সদস্য হলেন-বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউচার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব গকুল চাঁদ দাস।
ও্ইদিনই মুদ্রা পাচার আইনে মতিঝিল থানায় একটি মামলা দায়ের করে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাউন্টস অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের যুগ্ম পরিচালক জোবায়ের বিন হুদা মামলাটি দায়ের করেন।
মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, মোট পাঁচটি বার্তার মাধ্যমে ১০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হয়।
এতে উল্লেখ করা হয়, কিছু তথ্য হাতে না থাকায় মামলা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছুটা সময় নিয়েছে।
এদিকে, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলাটি হওয়ায় এর তদন্ত করছে পুলিশে গোয়েন্দা বিভাগ-সিআইডি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরির ঘটনায়, মার্চের ১৫ তারিখে ড. ফরাসউদ্দিনের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি করে সরকার। ঘটনার রহস্য উদঘাটনে এ তদন্ত কমিটিকে এক মাসের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদন এবং আড়াই মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনা দেয় অর্থ মন্ত্রণালয়।
উল্লেখ, গত ৫ ফেব্রুয়ারি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউইয়র্কে রক্ষিত বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হয়। ফিলিপাইনের একটি পত্রিকায় এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে বিষয়টি জানাজানি হয়।