দীর্ঘ প্রায় অর্ধশতক ধরে একদলীয় রাষ্ট্র হিসেবে কিউবা শাসন করা কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো শুক্রবার রাতে মারা গেছেন।
এই বিপ্লবী গত এপ্রিলে সর্বশেষ জনসম্মুখে ভাষণ দেন।
ওই ভাষণে তিনি বলেন, 'কিউবার সাম্যবাদী ধারণা এখনো কার্যকরী এবং কিউবার জনগণ বিজয়ী হবে।'
গত এপ্রিলে কিউবার কমিউনিস্ট পার্টির তিন দিনের কংগ্রেসের শেষ দিনে ওই বিরল ভাষণ দেন কিউবা বিপ্লবের সর্বাধিনায়ক ফিদেল কাস্ত্রো। এই ভাষণকে কোনো কোনো বিশ্লেষক 'বিদায়ী ভাষণ' বলেও অভিহিত করেছিলেন ওইসময়।
ভাষণে ফিদেল কাস্ত্রো নিজের বয়স সম্পর্কেও মন্তব্য করে বলেন, 'আর কিছু দিন পরই আমার বয়স হবে ৯০ এটি এমন এক বিষয় যা আমি কখনও কল্পনাও করিনি। এই দীর্ঘায়ু কোনো প্রচেষ্টার ফল নয়, এটি ভাগ্যের।'
তিনি আরো বলেন, 'খুব সহসাই আমি আর সবার মতোই হয়ে যাব পালা করে আমাদের প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই তা আসবে।'
কিউবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ফিদেল কাস্ত্রোর ভাষণটি সরাসরি সম্প্রচার করে। ভাষণে ফিদেল বলেন, 'কেউ যদি আন্তরিকভাবে কাজ করে তাহলে তার পক্ষে মানুষের দরকারি বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মঙ্গল সাধন সম্ভব। কমিউনিস্ট কিউবার ভাবনা এই পৃথিবীতে এর বাস্তব প্রমাণ হিসেবে টিকে থাকবে।' সিএনএন, এএফপি।
তার গুরুত্বপূর্ণ কথা:
স্বচ্ছল পরিবার থেকে আইনজীবী হয়ে সহজ জীবন কাটানোর পথ সরিয়ে রেখে ঝঞ্ঝামুখর এক বর্ণিল জীবন পেরিয়ে ৯০ বছর বয়সে শনিবার জীবনাবসান ঘটল ফিদেল কাস্ত্রোর।
কিউবার স্পেনিশ বংশোদ্ভূত একটি পরিবার থেকে কীভাবে ফিদেল হয়ে উঠলেন বিশ্বের মুক্তিকামীদের নেতা?
আগস্ট ১৩, ১৯২৬: কিউবার পূর্বাঞ্চলীয় বিরানে স্পেনিশ বংশোদ্ভূত একটি স্বচ্ছল পরিবারে জন্ম ফিদেলের।
জুলাই ২৬, ১৯৫৩: কিউবার সামরিক একনায়ক বাতিস্তার বিরুদ্ধে একটি ব্যির্থ সামরিক অভ্যূেত্থানে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে ধরা পড়েন।
মে, ১৯৫৫: ‘ইতিহাস আমাকে মুক্তি দেবে- বিচারে নিজের সম্পর্কে এ বক্তব্যচ দেওয়ার পর কাস্ত্রোকে ক্ষমা করে দেওয়া হয়। তিনি মেক্সিকো চলে যান।
ডিসেম্বর ২, ১৯৫৬: ৮১ জন সঙ্গী নিয়ে ছোট ছোট নৌকায় কিউবায় পদার্পণ করে নাস্তানাবুদ হন। ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে বেঁচে যান ভাই রাউল কাস্ত্রো, বন্ধু আর্জেন্টাইন বিপ্লবী চে গেভারাসহ ১২ জন। তারা পরে সিয়েরা মায়াস্ত্রো পার্বত্যােঞ্চলে সংগঠিত হয়ে গেরিলা যুদ্ধ শুরু করেন।
জানুয়ারি ১, ১৯৫৯: বাতিস্তা ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে পালিয়ে যান।
জানুয়ারি ৮, ১৯৫৯: কিউবাজুড়ে বিজয়যাত্রা শেষে কাস্ত্রো হাভানায় প্রবেশ করেন। সামরিক বাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডেন্ট হিসাবে তিনি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা করেন। কৃষি সংস্কার এবং অধিকাংশ দেশি-বিদেশি ব্যেবসা জাতীয়করণের সূচনা করেন।
১৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৯: কিউবার প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন কাস্ত্রো।
৩ জানুয়ারি ১৯৬১: হাভানার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে যুক্তরাষ্ট্র।
১৬ এপ্রিল, ১৯৬১: কাস্ত্রো তার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ঘোষণা করেন।
এপ্রিল ১৯, ১৯৬১: যুক্তরাষ্ট্রের মদদপুষ্ট নির্বাসিত কিউবানদের আক্রমণ প্রতিহতে সেনাদের নির্দেশনা দেন কাস্ত্রো।
ফেব্রুয়ারি ৭, ১৯৬২: কিউবার উপর জাতিসংঘ পূর্ণ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে।
অক্টোবর, ১৯৬২: মিসাইল সংকট। কিউবায় সোভিয়েত টর্পেডোর উপস্থিতি মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্য কার অচলাবস্থা উস্কে দেয়। অনেকেই পরমাণু যুদ্ধের আশংকা করে। তবে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি নৌ-অবরোধ আরোপ করলে সোভিয়েত ইউনিয়ন মিসাইল প্রত্যা্হারের ঘোষণা দেয়।
অক্টোবর, ১৯৬৫: কিউবান কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের পর তিনি প্রথম সাধারণ সম্পাদক হন। বামপন্থি সরকারের প্রতি সমর্থন জানাতে কাস্ত্রো চিলি, পানামা, নিকারাগুয়া সফর করেন।
১৯৭৫: দক্ষিণ আফ্রিকা মদদপুষ্ট বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধে বামপন্থি সরকারকে সহযোগিতা করতে কাস্ত্রো অ্যা ঙ্গোলায় সেনা পাঠান।
১৯৭৬: নবগঠিত ন্যা শনাল এসেম্বলির অনুমোদনে কাস্ত্রো প্রেসিডেন্ট হন।
১৯৮০: প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কিউবানকে দেশত্যাোগে অনুমতি দেওয়া হয়, যাদের অধিকাংশ মেরিয়েল বন্দরের মাধ্যলমে দেশত্যাাগ করে।
১৯৯১: সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন কিউবাকে অর্থনৈতিক সংকটে ফেলে।
অগাস্ট ১৪, ১৯৯৩: মার্কিন ডলার ব্যিবহারে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যায়হার করে কাস্ত্রো সরকার। এটা সীমিত পরিসরে অর্থনীতির দ্বার খুলে দেওয়ার ধারাবাহিক কর্মসূচির একটি, তবে তা বিপ্লব সুরক্ষার জন্যধ করা হচ্ছে বলে সরকার জানায়।
অগাস্ট ৫, ১৯৯৪: বিপ্লবের পর কাস্ত্রোবিরোধী সবচেয়ে বড় বিক্ষোভে শত শত হাভানাবাসী।
অগাস্ট-সেপ্টেম্বর, ১৯৯৪: ফি বছর ২০ হাজার কিউবানকে বৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের ভিসা প্রদান সংক্রান্ত দ্বি-পক্ষীয় চুক্তির সুবিধা নিয়ে গ্রীষ্মকালীন সঙ্কট চলাকালে নৌপথে ৩৫ হাজারেরও বেশি কিউবান দেশত্যাভগ করে।
ফেব্রুয়ারি ২৪, ১৯৯৬: কিউবান মিগ ফাইটাররা যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ছোট বিমান ভূপাতিত করে, যাতে চার ক্রু নিহত হয়।
জানুয়ারি ২১-২৫, ১৯৯৮: পোপ জন পলকে তার প্রথম সফরে স্বাগত জানান কাস্ত্রো।
নভেম্বর ২৫, ১৯৯৯: জুন ২৮, ২০০০: যুক্তরাষ্ট্রের সীমানায় জাহাজডুবিতে মায়ের মৃত্যুবর পর ৬ বছর বয়সী কিউবান শিশু এলিয়ানকে দেশে ফেরাতে কাস্ত্রো ব্যা পক প্রচার শুরু করেন। শেষ পর্যন্ত ওই শিশু কিউবায় ফেরে।
জুন ১২, ২০০২: ভিন্ন মতাবলম্বী ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবেলায় এক মিলিয়ন কিউবানকে নিয়ে পদযাত্রায় অংশ নেন কাস্ত্রো।
জুন ২৬, ২০০২: ন্যা শনার এসেম্বলিতে সংবিধান সংশোধন করে সমাজতন্ত্রকে স্থায়ী বলে ঘোষণা করে কিউবা।
মার্চ ১৮, ২০০৩: ভিন্ন মতাবলম্বীদের দমন শুরু করেন কাস্ত্রো। গণতন্ত্রকামী ৭৫ কর্মী এবং সাংবাদিকের কারাদণ্ড হয়, আন্তর্জাতিকভাবে যার সমালোচনা হয়।
২৪ অক্টোবর, ২০০৪: সান্তা ক্লারায় ভাষণ দেওয়ার সময় পড়ে বাম হাঁটু ভেঙে ফেলেন ফিদেল কাস্ত্রো।
৩১ জুলাই, ২০০৬: অজ্ঞাত রোগে অভ্য ন্তরীণ রক্তক্ষরণ থামাতে আকস্মিক সার্জারি চলাকালে কাস্ত্রো ভাই রাউলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০০৮: রাষ্ট্রপ্রধানের পদে আর না ফেরার ঘোষণা দেন তিনি।
বিশ্বের আলোচিত ব্যক্তিত্ব বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন মন্তব্য করেছেন। তাঁর ক্ষুরধার এসব মন্তব্যও বারবার আলোচনায় এসেছে।
বিভিন্ন সময়ে করা তার ১০টি উক্তি:
১. ‘আমার নিন্দা করুন। এটা কোনো গুরুত্ব পাবে না। ইতিহাস আমাকে অব্যাহতি দেবে।’
১৯৫৩ সালে সান্তিয়াগোতে মোংকাদা সামরিক ব্যারাকে আত্মঘাতীতুল্য হামলার অভিযোগে চলা বিচারে আত্মপক্ষ সমর্থন করে এ কথা বলেন কাস্ত্রো।
২. ১৯৫৯ সালে : ‘আমি ৮২ জনকে নিয়ে বিপ্লব শুরু করি। তা যদি আমাকে আবার করতে হয়, তবে আমি ১০ বা ১৫ জনকে নিয়ে করব এবং সম্পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে করব। সংখ্যায় আপনি কত কম, সেটা কোনো বিষয় নয়, যদি আপনার বিশ্বাস ও কর্মপরিকল্পনা থাকে।’
৩. ‘আমি আমার দাড়ি কেটে ফেলার কথা ভাবছি না। কারণ, আমি আমার দাড়িতেই অভ্যস্ত এবং আমার দাড়ি আমার দেশের জন্য অনেক অর্থ বহন করে। সুশাসনের জন্য আমরা যেদিন আমাদের অঙ্গীকার পূরণ করতে পারব, সেদিন আমি দাড়ি কাটব।’ ১৯৫৯ সালে বিপ্লবের ৩০ দিন পর সিবিএসের অ্যাডওয়ার্ড মুরোকে দেয়া এক সাক্ষাৎকার।
৪. ‘আমি অনেক আগেই এ ব্যাপারে উপসংহারে পৌঁছেছি যে ধূমপান ছেড়ে দেয়ার মধ্যদিয়ে কিউবার জনগণের জন্য আমাকে এ শেষ ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে। আমি আসলেই ধূমপানের তেমন অভাব বোধ করি না।’
১৯৮৫ সালের ডিসেম্বরে ধূমপান ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিতে গিয়ে এ কথা বলেছিলেন কাস্ত্রো।
৫. ‘আমাকে জিইয়ে রাখা মতাদর্শ আর ব্যতিক্রমী মূর্তির (যিশুখ্রিষ্ট) প্রতীকী মতাদর্শের মধ্যে কখনো কোনো তফাত দেখিনি।’ ১৯৮৫ সালে কাস্ত্রো এই উক্তি করেন।
৬. ‘ভাবুন তো, সাম্যবাদের সম্প্রদায় যদি হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়, পৃথিবীতে তখন কী হবে...যদি তা সম্ভব হতো এবং আমি মনে করি না যে এটা সম্ভব।’ ১৯৮৯ সালে কাস্ত্রোর মন্তব্য।
৭. ‘বিপ্লবের সবচেয়ে বড় উপকার হচ্ছে, আমাদের যৌনকর্মীরাও গ্র্যাজুয়েট।’ ২০০৩ সালে পরিচালক অলিভার স্টোনকে এ কথা বলেন কাস্ত্রো।
৮. ‘কিউবার মডেল আমাদের জন্য আর কোনো কাজে আসবে না।’ ২০১০ সালে মার্কিন সাংবাদিক জেফ্রে গোল্ডবার্গকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন কাস্ত্রো। তবে পরে এ বিষয়ে কাস্ত্রো বলেছিলেন, তাঁর এ মন্তব্য অপ্রাসঙ্গিকভাবে টেনে আনা হয়েছিল।
৯. ‘আমি উপলব্ধি করেছি যে আমার সত্যিকারের নিয়তি হচ্ছে যুদ্ধ, যা আমি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করতে যাচ্ছি।’ কিউবার এই নেতার ওপর ২০০৪ সালে পরিচালক অলিভার স্টোন নির্মিত দ্বিতীয় তথ্যচিত্র ‘লুকিং ফর ফিদেল’-এ এই মন্তব্য করেন কাস্ত্রো।
১০. ‘৮০ বছরে পৌঁছাতে পেরে আমি সত্যিই খুশি। আমি তা কখনো আশা করিনি, অন্তত এমন প্রতিবেশী পাওয়ার কথা ভাবিনি, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর যে প্রতিবেশী প্রতিদিন আমাকে হত্যার চেষ্টা করেছে।’
২০০৬ সালের ২১ জুলাই আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত লাতিন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট সম্মেলনে অংশ নিয়ে এ কথা বলেছিলেন ফিদেল কাস্ত্রো।