রাজধানীর গুলশানে স্প্যানিশ রেস্তোরাঁ হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী, মদদ-আশ্রয় ও অর্থদাতাদের অনেককে এরইমধ্যে চিহ্নিত করতে পেরেছেন তদন্তকারীরা। এমন যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ যৌথভাবে তদন্তে থাকা নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে এসেছে বলে তারা আভাস দিয়েছেন।
খতিয়ে দেখা হচ্ছে আন্তর্জাতিক যোগসাজসও। দ্রুত এ ঘটনার নেপথ্য-হোতাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ গোয়েন্দাদের।
গুলশানের রেস্তোরায় যে ধরণের নৃসংশ জঙ্গি হামলা ঘটেছে—তা দেশে এ প্রথম। এতে দারুনভাবে নড়েচড়ে বসেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। বৈশ্বিক জঙ্গি হামলার কায়দায় এ হামলা হওয়ায় ঘটনার ছক বুঝতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে তাদের।
পর্যাপ্ত আলামত হাতে আসায় ক্রমেই হতবাক হচ্ছেন তারা। প্রতিনিয়তই বেড়িয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
এরইমধ্যে তদন্তে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার জোর ইঙ্গিত দিয়েছেন তারা। দু'টি রাজনৈতিক দলের বিপথগামী সদস্যদের জঙ্গি সম্পৃক্ততার বিষয়টি তদন্তকারীদের কাছে পরিস্কার।
তবে গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলার পরিকল্পনা কাটআউট পদ্ধতিতে করায় এক গ্রুপ অন্য গ্রুপের তথ্য দিতে পারছে না।
এছাড়াও তদন্তে বেরিয়ে এসেছে আন্তর্জাতিক যোগসাজসের বিষয়। এ দুই হামলার পর দেশি গোয়েন্দারা বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত কানাডীয়ান নাগরিক তামিম চৌধুরীর দিকে সবোচ্চ মনোযোগ দিচ্ছেন।
তাদের বিবেচনায় রয়েছে অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী আবু তারেক মোহাম্মদ তাজউদ্দীন কাওসার ও জাপানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসনের অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ ওজাকি।
গোয়েন্দা মনে করছেন, সিরিয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়ে দুই থেকে তিন ডজন জঙ্গি বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন। কেউ আবার তুরস্কেও প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তৃতীয় আরেক গ্রুপ বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকার নিয়েছেন প্রশিক্ষণ। এসব জঙ্গিদের লিয়াজোঁকারিদেরও খুজছেন তারা।
যথেষ্ট তথ্য-প্রমান এরই মধ্যে হাতে এসেছে বলে দাবি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত জানাতে রাজি নন তারা।
মঙ্গলবার সন্দেহভাজন চারজনের ফুটেজ প্রকাশের পর বৃহস্পতিবার রাতে নরসিংদি থেকে ওই ফুটেজে থাকা নারীকে আটক করেছেন গোয়েন্দারা। গুলশান হামলার ঘটনায় জড়িত কিনা তা নিশ্চিত হতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে তাকে।
এদিকে, হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলাকারী জঙ্গিদের রক্ত, চুল ও নখের নমুনা যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (এফবিআই) এর কাছে হস্তান্তর করেছে কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিট।
অধিকতর তদন্তের জন্য শনিবার সকালে এফবিআই'র কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে নমুনা হস্তান্তর করা হয়।
এর আগে বুধবার সিএমএইচ-এ গিয়ে জঙ্গিদের মরদেহ থেকে রক্তের নমুনা সংগ্রহ করেন ঢাকা মেডিকেলের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসকরা।
এ ব্যাপারে ফরেনসিক দলের পক্ষে ডা. সোহেল মাহমুদ বলেন, জঙ্গিরা কোনো শক্তিবর্ধক বা মাদক সেবন করেছিলেন কি-না তা পরীক্ষা করে দেখা হবে। প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এই নমুনা পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটকে দেয়া হয়।
গত ১ জুলাই গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোঁরায় হামলার বিষয়টি তদন্তে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো (এফবিআই)।
উল্লেখ, ১ জুলাই শুক্রবার রাত পৌনে ৯টার দিকে গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হত্যাযজ্ঞ চালায় জঙ্গিরা। ১২ ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর জিম্মি সংকটের রক্তাক্ত অবসান ঘটে শনিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্যারাকমান্ডোর সমন্বিত অভিযানের মাধ্যমে।
অভিযান শেষে ঘটনাস্থল থেকে ২০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়, যাদের জঙ্গিরা আগেই ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করেছিল। এ ২০ জনের মধ্যে ১৭ জন বিদেশি নাগরিক ও ৩ জন বাংলাদেশি। উদ্ধার অভিযানে নিহত হয় আরো ছয় জন।
এর আগে শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রথম দফা উদ্ধার অভিযান চালাতে গিয়ে নিহত হন পুলিশের দুই কর্মকর্তা। আহত হন কমপক্ষে ৪০ জন।
জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) এ হামলার দায় স্বীকার করে। সংগঠনটির মুখপাত্র আমাক হামলাকারীদের ছবি প্রকাশ করে বলে জানায় জঙ্গি তৎপরতা পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা সাইট ইন্টেলিজেন্স।