বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলের ডাকা অবরোধ-হরতালে মাঠে নেই নেতাকর্মীরা। অবরোধ চলছে ২৯ দিনের মতো।
অথচ পেট্রলবোমা হামলায় প্রায় প্রতিদিনই প্রাণ হারাচ্ছেন অসহায় মানুষ। যাদের কেউই রাজনৈতিক কর্মী নয় এসব প্রাণহানির দায় নিচ্ছে না কেউই, পরস্পরকে দুষচ্ছে সরকারি ও বিরোধীজোট।
দিনে দিনে রাজনৈতিক সহিংসতার ধরনও বদলেছে টার্গেটে পরিণত হয়েছে শুধুই সাধারণ মানুষ। গত একমাসের অবরোধ আর হরতালে নজিরবিহীন সহিংসতায় ৫৮ জন মারা গেছেন।
সরকারের পদত্যাগের দাবিতে গত ৬ জানুয়ারি থেকে ২০ দলের টানা অবরোধ আর হরতাল কর্মসূচির নামে চলছে নজিরবিহীন সহিংসতা। অবরোধের ২৯তম দিন সহিংসতায় গতকাল-মঙ্গলবারই ১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরে রাজনৈতিক সহিংসতায় এটিই সর্বোচ্চ প্রাণহানির ঘটনা।
রাজধানীসহ দেশের ১০ জেলায় কমপক্ষে ২৬টি গাড়িতে আগুন দিয়েছে অবরোধকারীরা।
গত একমাসে পেট্রোলবোমায় ১৯ জেলায় প্রাণহানি ঘটেছে ৫৮ জন। আর ৯ জেলায় রেলে নাশকতা চালানো হয়। যানবাহনে আগুন ও ভাঙচুড়ের ঘটনা ঘটেছে ৯০৬টি।
এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত কুমিল্লায় পেট্রোলবোমায় মারা গেছেন ৮ জন। রংপুর, ঢাকা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও লক্ষ্মীপুর, বগুড়া, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, বরিশাল, যশোর, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, নাটোর, সিলেট, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, গাজীপুর, চাঁদপুর ও ফেনীতেও পেট্রোলবোমায় মারা গেছেন।
নিহত ৫৮ জনের ১৫ জন রাজনৈতিক নেতাকর্মী মারা গেলেও ৪৩ জনই সাধারণ মানুষ বলে জানা গেছে। তাদেরমধ্যে ৩৪ জন পেট্রোলবোমা, ককটেল ও আগুনে পুড়ে মারা যান তারা। সংঘর্ষ ও হামলায় ১০ জন, গুলিতে ১২ জন। এছাড়া অন্যান্যভাবে আরো ২ জন। আর পেট্রোলবোমায় দগ্ধ হয়ে বার্ন ইউনিটিতে ভর্তি হয়েছেন ১১১ জন।
এসব ঘটনায় দেশের বিভিন্ন থানায় জামাত-শিবির, বিএনপি নেতাকর্মীদের নাম উল্লেখ করে বা অজ্ঞাতনামে মামলা করা হয়েছে। অব্যাহত রয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তল্লাশি অভিযান।
বিগত দিনের কয়েকটি সংসদ নির্বাচনের সহিংসতার তথ্য থেকে দেখা যায় ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ষষ্ঠ ও সপ্তম সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৮২ জন। যারমধ্যে দলীয় নেতাকর্মী ৩৬ ও সাধারণ মানুষ রয়েছেন ৩২ জন। এরমধ্যে ২২ জন মারা যান গুলিতে, হামলায় ২৬, বোমায় ১৯ ও ১৫ জন অন্যান্যভাবে।
২০০১ সালের আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর অষ্টম সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৯৬ জন। যারমধ্যে দলীয় নেতাকর্মী ৭৯ ও সাধারণ মানুষ ১৭ জন। এরমধ্যে ১৪ গুলিতে, হামলায় ৫৫, বোমায় ১৮ ও ৯ জন অন্যান্য ভাবে।
২০০৬ সালের অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৩২ জন। যারমধ্যে দলীয় নেতাকর্মী ২৮ সাধারণ মানুষ ৪ জন।
২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর থেকে ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত দশম সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৫৯ জন। যার মধ্যে দলীয় নেতাকর্মী ১৯ সাধারণ মানুষ ৪০ জন। এরমধ্যে হামলায় ২৫, পেট্রোলবোমায় ২২ ও ১২ জন অন্যান্যভাবে।
ক্রমেই যেন এসব সহিংসতার মাত্রা বাড়ছে আর গত একমাসে বিভিন্ন খাতে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে ৬ লাখ ৮ হাজার ৩৩৫.৮ কোটি টাকা। পোশাক খাতে সবচেয়ে বেশি ২৫ হাজার ২৭৫ কোটি, পরিবহন খাতে ৯ হাজার কোটি, কৃষি খাতে ৮ হাজার ৬৪৩ কোটি, আবাসন ৭৫০০, পর্যটনে ৬৩০০, বাজার ও বিভিন্ন দোকানে ৪৫০০, উৎপাদনে ৩০০০, স্থলবন্দর ও সেতু খাতে ৯৯২.৪ কোটি, সিরামিক খাতে ৬০০, পোলট্রিতে ৫৪৮.৪ কোটি, প্লাস্টিক খাতে ৫৩৫.৫ কোটি, বিমা খাতে ৪৫০, হর্কাস ৪৫০, আমদানি পণ্য ৩০১.৫, হিমায়িত খাদ্যে ২৪০ কোটি টাকা। এমন তথ্য প্রকাশ করেছে ঢাকা চেম্বারস অ্যান্ড কর্মাশ ইন্ডাস্ট্রি।
এ ধরনের সহিংস রাজনৈতিক কর্মসূচির অবসান হবে কবে? আর কত সাধারণ মানুষ পুড়ে মারা গেলে এবং দেশের অর্থনীতিতে ধস নামলে রাজনীতিবিদদের শুভ বুদ্ধির উদয় হবে। কবে বন্ধ হবে এমন সহিংসতা তা জানাতে প্রশ্ন রাখেন আজ দেশের সাধারণ মানুষ।