প্রধানমন্ত্রী গতকাল জাতির উদ্দেশে তার ভাষণের শুরুতেই জাতিকে ভ্রান্ত তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন এ বলে মন্তব্য বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের।
শুক্রবার রাজধানীর গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
নিম্নে সংবাদ সম্মেলনের তথ্যউপাত্ত তুলে ধরা হলো:
তিনি বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে ২০১৪ এর ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের কথা বলেছেন, যা সঠিক নয়।
২০১৪ এর ৫ জানুয়ারি ১৫৩ জনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়েছিল। ৫% ভোটার ভোট কেন্দ্রে যায়নি। সারাদেশের মানুষ এবং বর্হিবিশ্ব সেই নির্বাচনকে গ্রহণ করেনি। আওয়ামী লীগ নির্বাচন কমিশন ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যবহার করে ক্ষমতা দখল করেছিল সম্পূর্ণ অনৈতিক ভাবে।
জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানকে বন্দুকের মুখে জিম্মি করে নির্বাচনে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। তিনি এবং আরও অনেকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করলেও সেটা গ্রহণ করা হয়নি। সেই সময়কার তামাশা ও নাটক সকলের মনে থাকার কথা।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে এমন ভাবে চিত্রায়িত করেছেন যে সকল উন্নয়ন তাঁর দুই দফার সরকারের ৮ বৎসরেই হয়েছে। যা সঠিক নয়। অর্থনৈতিক উন্নয়ন একটি চলমান প্রক্রিয়া। ভিত্তি তৈরি করতে হয়, এরপর একটি একটি করে ইট লাগাতে হয়। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দুঃশাসন ও দুর্নীতির কারণে এবং ভ্রান্ত নীতির কারণে যে অচল হয়ে পড়েছিল, বিদেশিরা তলাবিহীন ঝুড়ির সঙ্গে তুলনা করেছিল, দুর্ভিক্ষে লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিল, সেই অর্থনীতিকে সজীব ও সচল করে তুলেছিলেন স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে বাংলাদেশ ঘুরে দাড়িয়েছিলো। বহুদলীয় গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনে অবরুদ্ধ অর্থনীতিকে তিনি মুক্ত করেছিলেন। বেসরকারি বিনিয়োগ, মুক্তবাজার অর্থনীতি, কৃষিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার, শিল্পে ৩ শিফটের কাজ, সর্বপ্রথম পোশাক শিল্পের উদ্যোগ ও বিদেশে বাজার সৃষ্টি, মধ্যপ্রাচ্যে শ্রম বাজার সৃষ্টি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন এবং সচল অধ্যায়ে নিয়ে যায়। সেটাই ছিলো ভিত্তি। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান অর্থনীতিকে সচল করে। নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তারা এগিয়ে আসায় বাংলাদেশ আবার স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। পরবর্তী গণতান্ত্রিক, অগণতান্ত্রিক, বৈধ-অবৈধ প্রায় সব সরকারই কমবেশী উন্নয়নে কাজ করে।
ক্ষুদ্র্ঋণ, গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ, ইনফরমাল সেক্টরে বিনিয়োগ গ্রামীণ অর্থনীতিতে প্রাণের সঞ্চার করে। একদিকে নারী ক্ষমতায়ন অন্যদিকে নারীদের আনসার, ভিডিপি, পুলিশ ও অন্যান্য সেক্টরে কর্মসংস্থান অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করে। পৃথক মহিলা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা এই প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নিয়ে যায়।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে যে তিনটি সরকার গঠিত হয় সেই তিনটি সরকারের সময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নতুন মাত্রা পায়। দ্রুত সময়ের মধ্যে দারিদ্রবিমোচন, মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট লক্ষ মাত্রা অর্জন, জীবন যাত্রার মান উন্নয়ন, দুর্বল জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজগুলো কোন একটি বিশেষ সরকারের একক প্রচেষ্টার ফসল নয়। প্রধানমন্ত্রীর দাবি তাই অনৈতিক এবং শুধুমাত্র আত্মতুষ্টির প্রচেষ্টা।
গত ৮ বৎসরে ধনী আরও ধনী, গরীব আরও গবীব হয়েছে। শাসনের ফলে প্রাতিষ্ঠানিক ভঙ্গুরতা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
নজীর বিহীন দলীয় করণ, প্রশাসন ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গুলোকে দুর্বল ও ক্ষয়িষ্ণু করেছে।
জবাবদিহিতার অভাব, অকার্যকর পালার্মেন্ট দুর্নীতিকে লাগামহীন পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে অর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায় ধ্বংসের মুখে। শেয়ার মার্কেট লুট, ব্যাংক লুট, দলীয় ব্যক্তিদের জন্য ঋণ সুবিধা ও ফেরত না দেবার প্রবণতা একনায়ক সরকারের সমর্থক ও তল্পীবাহকেরা বা লাগামহীনভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার ও গণলুট বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ভেতরে ভেতরে অন্তঃসার শূন্য করে ফেলছে। শুধু মাত্র আর এম জি সেক্টরের আয় ও রেমিন্টেন্সের কারণে যে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়লেই অর্থনীতি চাঙ্গা হয় না। সত্যিকার বিনিয়োগ অর্থাৎ ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পে বিনিয়োগের জন্য মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কত পরিমাণ বেড়েছে না কমেছে সেটা দেখা অত্যন্ত জরুরি। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে কিনা তাও দেখতে হবে।
সাপ্লায়ার্স ক্রেডিটে বিদেশি বিনিয়োগ কোনো ক্ষেত্রে কিভাবে আসছে তা দেখতে হবে এবং এর জন্যে জনগণকে কতোটুকু প্রকৃত মূল্য দিতে হচ্ছে? সেই বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে সুকৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রথম ৭ এর কোঠা অতিক্রম করে ২০০৬-২০০৭ অর্থবছরে। তার আগে ২০০৫-০৬ সালে প্রবৃদ্ধি ছিল ৬.৭৬% । প্রধানমন্ত্রী দাবি করেন ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৭.১১%, আর আগামী বছরে হবে ৭.৪% হারে।
এদিকে বিশ্বব্যাংক তাদের গ্লোবাল ইকোনোমিক প্রসপেক্টাস প্রতিবেদনে দাবি করেছে যে এ বছরে প্রবৃদ্ধি হবে ৬.৮%। আর আগামী বছর অর্থাৎ ২০১৭-১৮ বছরে প্রবৃদ্ধি হবে ৬.৫%। কারণ যেসব উপাদানের উপর প্রবৃদ্ধি নির্ভর করে বিশেষ করে বিনিয়োগ ও রেমিট্যান্স সেগুলো নিম্নগামী রয়েছে। বার বার জিডিপি হিসেবের বিভ্রাটে ফেলা হচ্ছে জাতিকে।
বিএনপির আমলে ৭% অতিক্রম করেছে যে প্রবৃদ্ধি বর্তমান সরকারের আমলে তা বরং হ্রাস পেয়েছে।
আমাদের জনগণ নিশ্চয়ই ভুলে যায়নি যে ২০০৫-০৬ সনে গোল্ডম্যান স্যাকস বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশভুক্ত করেছে, আর বিশ্বখ্যাত বিদেশি পত্রিকা বাংলাদেশকে আখ্যা দিয়েছিল। আজকের প্রথম আলোতেই দেখলাম বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জিডিপির হিসেবের যে ইংগিত দিয়েছে তা সরকারের দাবির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
মাথাপিছু আয় ৫৪৩ থেকে বেড়ে ১৪৬৬ ডলার হয়েছে। কিন্তু শুভংকরের ফাঁকি হল আয় বৈষম্য বেড়েই চলেছে। উন্নয়নের সুফল কিছু সরকারের অনুগ্রহপুষ্ট ব্যক্তিদের কাছে কুক্ষিগত হচ্ছে। দরিদ্র্য ও নিম্ন মধ্যেবিত্তের অবস্থা আরো শোচনীয় হচ্ছে।
আমাদের সেন্ট্রাল ব্যাংকের বৈদেশিক রিজার্ভের ১০১ মিলিয়ন ডলার চুরি হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি সারাবিশ্বের ব্যাংকিং ইতিহাসে চাঞ্চচল্যের স্থান পেয়েছে।
সরকার ড. ফরাস উদ্দিন কমিটির রিপোর্ট নিয়ে লুকোচুরি খেলছে। মনে হচ্ছে কোনো রাঘব বোয়ালের নাম আড়াল করতেই এ লুকোচুরি। আমরা দাবি করছি তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশ করা হোক, যত ক্ষমতাধরই হোক দায়ী ব্যাক্তিদের বিচারের আওতায় আনা হোক, লোপাটকৃত অর্থ ফেরত আনা হোক।
সরকারি লোকজন বেসিক ব্যাংকসহ রাষ্ট্রায়ত্ত্ব ব্যাংকগুলোকে ফোঁকর করে দিচ্ছে। হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নেয়া হয়েছে ব্যাংকগুলো থেকে। এ সব দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে প্রতি বছর সাধারণ মানুষের করের টাকা থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা সাহায্য দিয়ে এসব পর্যুদস্ত ব্যাংকগুলোকে করার কাজটি প্রায় প্রাতিষ্ঠানিকিকরণ করা হচ্ছে যা অনৈতিক।
আমাদের সময় বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করে বিশেষ করে ‘ইডকল’ এর মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে সোলার হোম সিস্টেম বসানোর কাজ দ্রুত এগিয়ে নেয়া হয়। ২ লাখ সোলার লাগানোর পরে খালেদা জিয়া তা আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ভোধন করেন। ওই ধারাবাহিকতায় সোলার হোম সিস্টেমের কাজ চলছে যাকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু আমরা উদ্বিগ্ন কুইক রেন্টাল পাওয়ার প্লান্টের নামে জনগণের পকেট কেটেই চলেছে।
২০২১ সনে উচ্চ মাধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে আমাদের আরও বিদ্যুতের প্রয়োজন। তাই বলে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ, আমাদের প্রাকৃতিক ঢাল সুন্দরবন বিধ্বংসী রামপাল কয়লা ভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প কিছুতেই নয়। পরিবেশ বিনষ্টকারী ও সুন্দরবন ধ্বংসকারী রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত যখন একাট্টা, সরকার তখন আরও বিদ্যুৎ উৎপাদনের নামে রামপাল প্রকল্প বাস্তবায়নে একগুয়ে হয়ে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে। আমরা পুনরায় এই মানবতাবিরোধী প্রকল্প থেকে সরে আসার জোর দাবি জানাচ্ছি।
পরমাণু ক্লাবে যুক্ত হওয়ার নামে সরকার রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের জন্য রাশিয়ার সাথে ১৩ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছে। রূপপুরের প্রস্তাবিত পারমাণবিক প্রকল্পের বর্জ রাশিয়ায় ফেরত নেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে রাশিয়া।
এই পারমাণবিক বর্জ্য বাংলাদেশে শত বছর ধরে সংরক্ষণ আদৌ সম্ভব নয়। জাপানসহ অন্যান্য দেশে একই প্রযুক্তির পারমাণবিক কেন্দ্র বিস্ফোরণের ফলে প্রাণহানি ও অন্যান্য ক্ষতির জের এখনও তারা বয়ে চলেছে।
আমাদের মত ঘনবসতিপূর্ণ জণাকীর্ণ দেশে এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্প স্থাপনের ভয়াবহতা কল্পনাও করা যায় না। তাছাড়া এ প্রকল্পের আর্থিক ও অন্যান্য কারিগরি দিকগুলোও বিশ্লেষণের দাবি রাখে। এ ধরনের ভয়াবহ প্রাণহানী ও সম্পদ বিধ্বংসী প্রকল্প বাস্তবায়ন করার পূর্বে বিষয়টি আরও গভীরভাবে বিচার বিশ্লেষণ করা অত্যাবশ্যক।
আশ্রয়ন প্রকল্প ও ১টি বাড়ি ১টি খামার প্রকল্পের নামে সারাদেশে আওয়ামীলীগ দলীয় নেতাকর্মীদের দুর্নীতির ফিরিস্তি প্রায় প্রতিদিন পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে।
প্রতি কেজি ১০ টাকা মুল্যে চাল সরবরাহের নামে সরকার ‘১০ ধরনের অনিয়ম’ করছে বলে ১১/১০/১৬ তারিখে প্রথম আলোসহ পত্র পত্রিকায় ধারাবাহিক সংবাদ প্রতিবেদন বের হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছেন তাঁর সরকার শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন করেছে গত ৮ বছর ধরে এ দেশে শিক্ষার কি উন্নতি হয়েছে তা তো জনগণ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে।
জিপিএ-৫ বৃদ্ধি আর ছাত্রছাত্রীদের ফেল না করার নীতি গ্রহণ করে সরকার শিক্ষার গুনগত মানকে ধ্বংস করে দিয়েছে। এ বছর জিপিএ-৫ পাওয়া ছাত্র-ছাত্রীদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় মাত্র ৫.৫২% টিকেছে। পত্র-পত্রিকায় আমাদের অধিকাংশ গ্র্যাজুয়েটদের শিক্ষার মানের যে চিত্র ফুটে উঠছে তাতে লজ্জায় মাথা হেট হয়ে যায়। চক চকে মলাটের রঙ্গিন বই ছাত্রছাত্রীদের হাতে ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে। এনসিটিবিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভুলে ভরা প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাঠ্য পুস্তুকের দায় দায়িত্ব এড়াতে পারে না। অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকছে ছাত্রলীগের অর্ন্তঃদ্বন্দ্বে রক্তাক্ত হয়ে। ভিন্ন মতের ছাত্রছাত্রীদের তো টিকতেই দেয়া হচ্ছে না। শিক্ষকমণ্ডলী অবরুদ্ধ হয়েছেন। এমন কি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তারা। এই হচ্ছে সামগ্রীক শিক্ষা উন্নয়নের চিত্র। অথচ আমাদের সময়ে বেসকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের যে সুযোগ দেয়া হয়েছে তার ফলে উচ্চ শিক্ষার প্রসার ঘটছে। বিদেশমুখী ছাত্রছাত্রীরা এখন দেশেই উচ্চ শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী সড়ক উন্নয়নের ফিরিস্তি দিয়েছেন। কিন্তু তিনি বলেননি বাংলাদেশের ১ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ ও ১ কিলোমিটার ফ্লাইওভার নির্মাণ ব্যয় চীন, ভারত ও যুক্তরাজ্যের চেয়ে কত বেশি। তিনি বলেননি নানা অজুহাতে মেগা প্রজেক্টগুলোর প্রকল্প ব্যয় কয়েকশগুণ বৃদ্ধি করে মেগা চুরির কি সুবন্দোবস্ত করা হয়েছে।
পদ্মা সেতুর প্রকল্প ব্যয় ছিলো ১১ হাজার কোটি টাকা আর তা বাড়িয়ে করা হয়েছে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা। মালিবাগ ফ্লাইওভারসহ প্রায় সবগুলো ফ্লাইওভারের প্রকল্প ব্যয় এভাবে কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। সরকার মেগা প্রকল্প গ্রহণে বেশি আগ্রহী কারণ এতে তারা মেগা চুরির সুযোগ সৃষ্টি করেন। সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দরের ভবিষ্যত কি জনগণ তা জানতে চায়।
দেশে বিনিয়োগ বান্ধব পরিবেশ নেই। সরকারি দলীয় লোকজনের চাঁদাবাজি, গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে বিনিয়োগ রুদ্ধ হয়ে পড়েছে। আর তাই দেশের পুঁজি পাচার হয়ে যাচ্ছে বিদেশে। কেবল ২০১৩ সনে ৭৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। ২০০৭-২০১২ পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য পুঁজি বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে। এসব তথ্য গ্লোবাল ফিনেলসিয়াল ইন্ট্রিগ্রিটির সূত্রে জানা গেছে।
ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাবৃন্দ বিনিয়োগে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেছে দেশের ভয়াবহ রাজনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার কারণে, রাজনৈতিক সংকট ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিরোধীদল কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে না। রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। ডেমোক্রেটিক স্পেস ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে।
দেশবাসীর গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে উন্নয়ণের নামে বর্তমান সরকার জনগণকে বিভ্রান্ত করছে। জনগণ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারছে না। বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা ভূলুণ্ঠিত। আইনের শাসন অনুপস্থিত। মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নেই। দেশে এখন স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নেই। সরকারের রথি মহারথিরা গণতন্ত্রের চাইতে উন্নয়নকে প্রাধান্য দেয়ার নামে সকল সামাজিক চুক্তি ভঙ্গ করে জনগণকে শৃংখলিত করছে। উন্নয়নের নামে চলছে বল্গাহীন লুণ্ঠন। দেশে গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী অলিগার্কি।
পরীক্ষিত, জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে মিথ্যা মামলায় জালে জড়িয়ে রাজনীতি থেকে দূরে রাখার অপচেষ্টা, ৩ বারের নির্বাচিত জনপ্রিয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী খালেদা জিযার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানকে অন্যায়ভাবে সাজা দেয়া, গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ, বিচার বিভাগসহ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে দলীয় ক্যাডারদের নিয়োগ, পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
জঙ্গিবাদ প্রকৃত পক্ষেই বাংলাদেশের স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করছে। দলীয় সংকীর্ণতার উর্ধ্ব ওঠে এ বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য তৈরি করে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা ছিলো সময়ের প্রয়োজন। অথচ তা না করে বিরোধীদলকে দায়ী করে বিভক্তি সৃষ্টি জঙ্গিবাদকে আরো প্রশ্রয় দিচ্ছে। প্রকৃত সত্য অন্ধকারেই থেকে যাচ্ছে। ক্রসফায়ার, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, খুন, পুলিশি হেফাজতে হত্যা, মিথ্যা মামলায় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের হয়রানী, দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে অসহনীয় করে ফেলেছে।
এইসবের প্রেক্ষাপটে দেশবাসীর প্রত্যাশা ছিলো প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে এই সংকট চিহ্নিত করবেন এবং তা নিরসনের পথের সন্ধান দেবেন। সেটাই ছিলো তাঁর জন্য রাষ্ট্র নায়কোচিত কাজ। তিনি তা না করে রাজনৈতিক দলগুলোকে শুধুমাত্র নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে বলেছেন।
আমরা তো নির্বাচন অংশ নিতে চাই। কারণ আমরা বিশ্বাস করি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেই জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠা হতে পারে। সেজন্যে প্রয়োজন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে নির্বাচনকালীন সময়ে নিরপেক্ষ একটি সহায়ক সরকারের অধিনে একটি নিরপেক্ষ, সাহসী, যোগ্য নির্বাচন কমিশনের পরিচালনায় সকল দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি নির্বাচন। সেজন্য তৈরি করতে হবে। বর্তমানে যে বিরোধীদল নির্মূল করার প্রক্রিয়া চলছে তা বন্ধ করতে হবে। সকল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে মুক্তি দিতে হবে। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। সভা, মিছিল, সমাবেশ করার সমান সুযোগ দিতে হবে। গণমাধ্যমকে স্বাধীনতা দিতে হবে। এক কথায় একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিবেশ, রাজনীতিকে তার স্বাভাবিক চলার পথে চলতে দিতে হবে। উন্নয়নের কথা বলে, গণতন্ত্রকে হত্যা করে, জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করে, একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করার অপচেষ্টা জনগণ কোনোদিনই মেনে নেবে না। আমরা এখনও আশা করি, প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্র ধ্বংস করার একদলীয় শাসন প্রবর্তনের ভয়ংকর রাস্তা থেকে সরে গিয়ে গণতন্ত্রের মুক্ত পথে চলবেন। জনগণের আশা আকাঙ্খা পূরণ করার জন্য বিরোধীদল গুলোর সঙ্গে আলোচনা করে আগামী নির্বাচন, এবং রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করবেন। নতুন আশার আলো দেখাবেন। অন্যথায় জনগণের কাছে তাকে জবাবদিহি করতে হবে।