দেশে বিভিন্ন জায়গায় বন্যা পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। সোমবার পদ্মা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের নদ-নদীর পানি বেড়েই চলেছে। কয়েক জায়গায় কমলেও এখনো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি।
মুন্সীগঞ্জ:
পদ্মার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় মুন্সীগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। নদীর পানি আরও বৃদ্ধি পেয়ে ভাগ্যকুল পয়েন্টে বিপদসীমার ৩০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের আরও নতুন কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি রয়েছেন ৩০টি গ্রামের প্রায় চল্লিশ হাজার মানুষ। পানিতে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলি জমি ও সবজির ক্ষেত।
কয়েকটি এলাকায় রাস্তায় পানি ওঠতে শুরু করেছে। এদিকে দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট। পানিবন্দি এলাকায় বৃদ্ধ ও শিশুদের মাঝে পানিবাহিত রোগ দেখা দিয়েছে।
জেলা প্রশাসক মো. সাইফুল হাসান বাদল জানিয়েছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় প্রশাসন সার্বিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ইতিমধ্যেই দুর্গত এলাকায় চাল ও নগদ টাকা সহায়তা দেয়া হয়েছে।
সিরাজগঞ্জ:
যমুনার পানি সামান্য কমলেও সিরাজগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনার পানি সাত সেন্টিমিটার কমে সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যমুনার পানি বিপদসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
তবে বন্যার পাশাপাশি টানা বৃষ্টিতে বন্যা কবলিতদের দুর্ভোগ আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
জেলার কাজিপুর, সিরাজগঞ্জ সদর, বেলকুচি, শাহজাদপুর, চৌহালী উপজেলার লক্ষাধিক মানুষ এখন পানিবন্দি। সেই সঙ্গে কাজিপুর উপজেলার মেঘাই রিং বাঁধ ভাঙায় নতুন করে তিনটি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছেন। টানা বন্যার কারণে বন্যাকবলিত মানুষদের বিশুদ্ধ খাবার পানির অভাবে ডায়রিয়া, আমাশয়সহ নানা পানিবাহিত রোগের লক্ষণ দেখা দিয়েছে।
সরকারিভাবে বিভিন্ন স্থানে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই কম। টানা বন্যায় মানুষ স্বাভাবিক কাজ করতে না পারায় তারা দুর্বিসহ জীবন যাপন করছেন।
শরীয়তপুর:
শরীয়তপুরের বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে পানি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশংকা করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
জেলার ২০টি ইউনিয়নের ২ শতাধিক গ্রামে মানুষের জীবনে নেমে এসছে চরম দুর্ভোগ। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন জেলার অন্তত ১ লাখ মানুষ। দুর্গত এলাকাগুলোতে এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণ সহায়তা পৌঁছায়নি।
তবে বন্যা কবলিতদের নামের তালিকা প্রস্তুতের কথা জানিয়েছে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক।
অধিকাংশ টিউবওয়েল তলিয়ে যাওয়ায় বন্যা কবলিত এলাকাগুলোতে বিশুদ্ধ খাবার পানি ও গো-খাদ্যের চরম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। শত শত একর ফসলী জমি তলিয়ে যাওয়ায় মারাত্বক ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। বিদ্যালয়ের মাঠ ও শ্রেণী কক্ষে বন্যার পানি প্রবেশ করায় ১০টি ঊচ্চ বিদ্যালয় এবং ২০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। নড়িয়া-সুরেশ্বর সড়কসহ জেলার একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় যান চলাচলে বিঘ্ন হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম:
কুড়িগ্রামে নদ-নদীর পানি ধীর গতিতে কমলেও ব্রহ্মপুত্রের পানি এখনও বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বসতভিটা ও নিম্নাঞ্চল থেকে পানি দ্রুত সরে না যাওয়ায় সীমাহীন দুর্ভোগে রয়েছেন বানভাসীরা। খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকটে ভুগছেন তারা। দুর্গত এলাকাগুলোতে দেখা দিয়েছে পানিবাহিত রোগ।
রাজিবপুর উপজেলার শিবেরডাংগী এলাকায় পাকা সড়ক ধসে যাওয়ায় রাজিপুর ও রৌমারী উপজেলার সাথে গত ২ দিন ধরে ঢাকার বাস চলাচল বন্ধ রয়েছে।
গত ১৮ দিন ধরে ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও তিস্তা অববাহিকায় তলিয়ে থাকা গ্রামগুলোর মানুষ জন নৌকা ও কলাগাছের ভেলায় আশ্রয় নিয়ে দুর্বিসহ দিন পার করছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবাদী পশুসহ আশ্রয় নেয়া লোকজন নিদারুন কষ্টে দিন পার করছেন। পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা না পাওয়ায় খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন অনেক পরিবারের সদস্যরা। অন্যদিকে চারণ ভূমি তলিয়ে থাকায় গবাদী পশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন বানভাসীরা।
স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি চিলমারী পয়েন্টে ২০ সেন্টিমিটার হ্রাস পেলেও এখনও বিপদসীমার ১ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তার পানি কাউনিয়া পয়েন্টে ২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেলেও কমেছে ধরলা নদীর পানি।
এদিকে, মাদারীপুর, জামালপুর মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন জায়গায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে।