সুন্দরবনের শেলা নদীতে ডুবে যাওয়া তেলবাহী ট্যাংকারটি নৌবাহিনীর সহায়তায় উদ্ধার করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে উদ্ধারকারী জাহাজ জোবায়দা-৩, জোবায়দা-৪, জ্বলন্ত ও ডিবি রাইজিং-৩ জাহাজটি উদ্ধারে তৎপরতা শুরু করে।
চারটি জাহাজ মিলে ডুবে যাওয়া ট্যাংকারটি সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের দিকে টেনে নিয়ে হয়েছে। তবে এখনো জাহাজটি ভাসানো সম্ভব হয়নি। নৌবাহিনীর সদস্যরা উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করছেন।
মংলার জয়মনি চরে জাহাজটিকে ভিড়িয়ে রাখা হয়েছে। জোয়ার আসার পর জাহাজটিকে তীরে তোলা হবে। পরে ফার্নেস তেল অপসারণ করা হবে বলে জানা গেছে।
এদিকে ট্যাংকার উদ্ধার ও নদীর তেল অপসারণে বরিশাল ও চট্টগ্রাম থেকে তিনটি উদ্ধারকারী জাহাজ বুধবার রওনা দিলেও ঘন কুয়াশার কারণে এখনো সেখানে পৌঁছায়নি।
শেলা নদী ও আশপাশের খালগুলোতেও ছড়িয়ে আছে তেল। এতে হুমকির মুখে পড়েছে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ। তেল ছড়িয়ে পড়া এলাকাটি সরকার ঘোষিত ডলফিনের অভয়ারণ্য। এ অভয়ারণ্যসহ সুন্দরবনের জলজ প্রাণীর অভয়াশ্রম শেলা নদী সংলগ্ন বিস্তৃত এলাকা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এদিকে, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এ নদীর সব রুটে নৌযান চলাচল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। বুধবার রাতে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়।
বুধবার রাতে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের এক জরুরি সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। বৈঠক শেষে জানানো হয়, ডুবে যাওয়া ট্যাংকার থেকে নির্গত তেল ছড়িয়ে পড়তে না পারে সেজন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
কুয়াশার কারণে উদ্ধারকারী জাহাজ প্রত্যয় ও নির্ভীক সুন্দরবনের এ নদীতে পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় বৃহস্পতিবার সকাল ৬টায় স্থানীয় জাহাজ ও কার্গো দিয়েই শুরু হয় "ওটি সাউদার্ন স্টার-৭" জাহাজটির উদ্ধারকাজ। সকাল সাড়ে ৭টার দিকে ডুবে যাওয়া জাহাজটি টেনে তোলা হয়।
এর আগে সকালে দেশ টিভিকে খুলনা পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ড. মল্লিক আনোয়ার হোসেন বলেন, ডুবে যাওয়া তেলবাহী ট্যাংকারের ফার্নেস অয়েল ছড়িয়ে পড়েছে পূর্ব সুন্দরবনের নদী খালে। আর ছড়িয়ে পড়ায় হুমকির মধ্যে রয়েছে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র।
আর সুন্দরবনের এ অঞ্চলের জীব বৈচিত্রে কথা বিবেচনায় এনে দ্রুত এই সমস্যার সমাধানের কথা জানানো হয়েছে। দ্রুত এ সমস্যার সমাধান করা না গেলে বড় ধরনের ক্ষতির আশংকা রয়েছে বলে জানান তিনি।
খুলনা বিভাগীয় বন কর্মকতা জহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, এ অঞ্চলের সুন্দরবনের জীব-বৈচিত্রের কথা বিবেচনায় এনে সকলকে সঙ্গে নিয়ে দ্রুত এ সমস্যা সমাধানের কথা চিন্তা করা হচ্ছে।
পাঁচ জেলার ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুরে গড়ে উঠেছে প্রকৃতির অন্যতম নীলাভূমি সুন্দরবন। আর এ বনে ৩৩৪ প্রজাতির বৃক্ষের সমরাহের মাধ্যমে বন গড়ে উঠেছে। এ বনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ ৩৭৫ প্রজাতির বন্যপ্র্রানীর আবাসস্থল। বনের সৌন্দর্য বর্ধনের জন্য বসবাস রয়েছে ৩১৫ প্রজাতি পাখ-পাখির সমারোহ। এ সব মিলিয়ে বিশ্বের ঐতিহ্য হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে অন্যতম এ প্রকৃতির সৌন্দর্য নীলাভূমি সুন্দরবন
আর এ তেলবাহী ট্যাংকার ডুবির ঘটনার পর থেকে এ বনের একটি অঞ্চলের জীববৈচিত্র পড়েছে হুমকির মধ্যে।
গতকাল ট্যাংকার ডুবে সাড়ে তিন লাখ লিটার জ্বালানি তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় দুই জাহাজ মালিকের বিরুদ্ধে ১০০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ মামলা করেছে বনবিভাগ।
বন বিভাগের চাঁদপাই পূর্বাঞ্চলীয় রেঞ্জের কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ মংলা থানায় মামলাটি করেন। তবে গতকাল পর্যন্ত জাহাজটি উদ্ধার কিংবা দূষণ নিয়ন্ত্রণে তেল অপসারণের তৎপরতা শুরু হয়নি। দূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে গতকাল দুপুরে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে রওনা হয় কান্ডারি-১০ নামের একটি জাহাজ।
বুধবার সচিবালয়ে দুপুরে সাংবাদিকদের এ ঘটনায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বলে জানান নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান।
দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক বেলায়েত হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
এদিকে, ডুবে যাওয়া ওটি সাউদার্ন স্টার-৭ নামের ট্যাংকারটি উদ্ধারে বেসরকারি তিনটি জাহাজ নিয়ে কাজ শুরু করে এর মালিক প্রতিষ্ঠান মেসার্স হারুন অ্যান্ড কোং।
দুটি জাহাজ দুই দিক থেকে সাউদার্ন স্টার-৭ কে আটকে রাখে, যাতে সেটি পুরোপুরি তলিয়ে না যায়। ট্যাংকারটির সামনের অংশ নদীতে ডুবে আছে। পেছনের অংশ ছিল পানির ওপরে।
নৌবাহিনীর জাহাজে ডুবুরি থাকলেও তেল সরানোর মতো আধুনিক সরঞ্জাম নেই বলে জানা গেছে।
খুলনা অঞ্চলের কমান্ডার মনীর মল্লিক জানান, তারা সনাতন পদ্ধতিতে বাঁশ ও কলাগাছ ব্যবহার করে পানির উপরিতলের তেল আলাদা করে সরানোর চেষ্টা করবেন।
এঘটনায় জাহাজটির মাস্টার মোখলেসের কোনো খোঁজ বৃহস্পিতবার সকাল পর্যন্ত পাননি উদ্ধার অভিযানে থাকা কোস্ট গার্ড সদস্যরা।
ওটি সাউদার্ন স্টার-৭ নামের ট্যাংকারটি গোপালগঞ্জের একটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য খুলনার পদ্মা অয়েল ডিপো থেকে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার ফার্নেস অয়েল নিয়ে যাচ্ছিল। মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে ‘টোটাল’নামে একটি কার্গো জাহাজের ধাক্কায় সাউদার্ন স্টারের একপাশের খোল ফেটে যায় এবং সেটি ডুবতে শুরু করে।
ট্যাংকারটির প্রায় সব ফার্নেস অয়েল বেরিয়ে মঙ্গলবারই সুন্দরবনের শেলা নদীর কমপক্ষে ২০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বলে বন কর্মকর্তারা জানান।
প্রসঙ্গত: গত মঙ্গলবার ভোরে সুন্দরবনের শেলা নদীতে টোটাল নামের এক জাহাজের ধাক্কায় তেলবাহী ট্যাংকার ওটি সাউদার্ন স্টার ৭ ডুবে যায়।