মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে একক পরিবার হিসেবে মানুষের ওপর সবচেয়ে নৃশংস অত্যাচার চালিয়েছিল তখনকার কনভেনশন মুসলিম লীগের সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী ও তার ছেলে ফাঁসিতে দণ্ডিত সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী।
হানাদার পাকিস্তানিদের সহায়তায় বাপ-ছেলে মিলে, অন্য অনুচরদের নিয়ে পুরো রাউজান ও চট্টগ্রাম শহরে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। চট্টগ্রাম শহরের রহমতগঞ্জের গুডস হিলে টর্চার সেল বসিয়ে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করে অসংখ্য মানুষকে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাকার মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষীদের কথায় উঠে আসে ভয়াবহ সেসব অত্যাচারের কথা।
একাত্তরে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত রাজাকার সাকা চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে গত ২২ নভেম্বর। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে চালানো তার বর্বরতার অন্যতম সাক্ষী পটিয়ার মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাকার যুদ্ধাপরাধ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের তৃতীয় সাক্ষী ছিলেন তিনি।
একাত্তরে দেশকে মুক্ত করতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন ২২ বছরের তরুণ সিরাজুল। সিরু বাঙালি নামে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখালেখির কারণে এই নামেই পরিচিত চট্টগ্রামে। যুদ্ধ করেছেন ১ নম্বর সেক্টরের ১৫১ নম্বর গ্রুপের গ্রুপ কমান্ডার হিসেবে।
খাগড়াছড়িতে যুদ্ধকালীন অবস্থায় মানুষের ওপর সাকা চৌধুরী ও তার পিতা ফজলুল কাদের চৌধুরীর অত্যাচার-নির্যাতনের খবর পান তিনি। ১৪ জুন ক্যাপ্টেন করিমের নির্দেশে সাকা চৌধুরীকে হত্যার উদ্দেশ্যে অপারেশন চালান সিরু বাঙালি। পায়ে গুলি লাগলেও সেদিন প্রাণে বেঁচে যান সাকা, নিহত হন সাকার গাড়িচালক।
একাত্তরের ১৩ এপ্রিল চট্টগ্রামের রাউজানের হিন্দু অধ্যুষিত উনসত্তর পাড়ায় ক্ষিতিশচন্দ্র মহাজনের বাড়ির পেছনের পুকুরপাড়ে ডাকা হয় শান্তি কমিটির সভা। এলাকার লোকজন সেখানে উপস্থিত হওয়ার পর সাকা চৌধুরীর নেতৃত্বে নিরস্ত্র মানুষের ওপর ব্রাশ ফায়ার করে হানাদারেরা। শহীদ হন ৭০ জনেরও বেশি মানুষ।
একই দিন শ্রী কুন্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূতন চন্দ্র সিংহের মন্দিরে পাকবাহিনী নিয়ে হাজির হয় সাকা। নূতন চন্দ্রের কথায় সন্তষ্ট হয়ে ফিরেও যায় পাকবাহিনী। তবে সাকার প্ররোচনায় আবারো ফিরে এসে প্রার্থনারত অবস্থায় টেনে হিঁচরে তাকে মন্দির থেকে বাইরে এনে গুলি করে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে শেষ গুলি চালান সাকা নিজে।
এপ্রিলের ১৭ তারিখে হাটহাজারী বাসস্ট্যান্ড থেকে সাকা চৌধুরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মোজাফফর ও তার ছেলে শেখ আলমগীরকে অপহরণ করে পাকবাহিনী। সেনাক্যাম্পে নিয়ে নির্মম নির্যাতন চালানো হয় তাদের ওপর। তাদের সন্ধান আজো মেলেনি।