শত বাধা পাড় করে বাংলাদেশ যে নিজের অর্থে পদ্মা সেতু নিমার্ণকাজ করতে পারে আজ তা প্রমাণ করেছে --জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
শনিবার বেলা একটার দিকে, জাজিরা পয়েন্ট- মাওয়া পদ্মাসেতুর নদী শাসন, মাওয়ার মূল সেতুর কাজ উদ্বোধন করে এসব কথা বলেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা সেই জাতি, যে জাতি সম্পর্কে জাতির পিতা বলেছিলেন, 'কেউ দাবায়া রাখতে পারবা না' আজকেও সেটি প্রমাণিত হতে যাচ্ছে।
কারও কাছে হাত পেতে নয় নিজেদের অর্থ দিয়ে আজ এ কাজ শুরু হলো—এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন।
এ সময় তিনি সংক্ষিপ্ত ভাষণে বলেন, এ সেতু নির্মাণ হলে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে বিশেষ করে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের। যোগাযোগ ব্যবস্থার, ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নতি হবে।
এর আগে শরীয়তপুরের জাজিরায় পদ্মা সেতুর মূল নির্মাণকাজের উদ্বোধন শেষে সুধী সমাবেশে শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ ষড়যন্ত্রের একটি অংশ ছিল।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণকাজের প্রকল্প হাতে নিলে বিশ্বব্যাংক এগিয়ে আসে-- তবে হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই তারা দুর্নীতির অভিযোগ আনে। যদিও এ বিষয়ে জানতে চাইলে তারা (বিশ্বব্যাংক) বিএনপি সরকারের সময়ের ২টি দুর্নীতির কাগজ দেখিয়েছে।
তিনি বলেন, বড় কাজ করতে গেলে হাত পাততে হবে—এ মানসিকতা ভাঙতেই নিজস্ব অর্থায়নে দেশের সবচেয়ে বড় এই অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
তিনি আরো বলেন, আমি চেয়েছিলাম, আমরা পারি, আমরা তা দেখাব।… আজ আমরা সেই দিনটিতে এসে পৌঁছেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাঙালি জাতি কারও কাছে মাথা নত করেনি, করবেও না।
এর আগে বেলা সোয়া ১১টার দিকে নাওডোবায় নবনির্মিত হেলিপ্যাডে পৌঁছায় প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী হেলিকপ্টার।
হেলিকপ্টার থেকে নেমেই মঞ্চের পাশে অবস্থিত একটি ফলক উন্মোচনের মধ্য দিয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্পের মূল কাজ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
এরপর সংক্ষিপ্ত বক্তব্য শেষে মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় সেতুর সার্ভিস পাইল উদ্বোধন করেন শেখ হাসিনা। এরপর দোগাছিতে সেতুর সার্ভিস এরিয়ায় প্রকল্পের অগ্রগতি পরিদর্শন করেন তিনি।
পরে দুপুর আড়াইটায় মাওয়া চৌরাস্তায় মুন্সীগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত জনসভায় ভাষণ দেয়ার কথা রয়েছে।
সেতু নিয়ে যত কথা:
এরইমধ্যে সেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে পদ্মাপাড়ে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। মূল প্রকল্পের ২৭% কাজ শেষ হয়েছে। নিজস্ব অর্থায়নে তৈরি হতে যাওয়া পদ্মাসেতু অর্থনৈতিক অগ্রগতি ছাপিয়ে এখন রাজনৈতিক বিষয় হয়েও দাড়িয়েছে।
দেড় বছর আগে শুরু হওয়া পদ্মাসেতুর নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন হবে ৬ ভাগে। ৫টি অবকাঠামোগত ও একটি তদারকি ও পরামর্শক সংক্রান্ত।
মূল সেতু ও নদী শাসনের কাজের জন্য চার বছর এবং সংযোগ সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ঠিকাদারদের সাড়ে ৩ বছর সময় বেধে দেয়া হয়েছে।
প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের এ সেতু দিয়ে রাজধানীসহ দেশের পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে সড়কপথে যুক্ত হবে দক্ষিণ জনপদের ১৯টি জেলা।
এদিকে, সেতু তৈরির ভারী যন্ত্রপাতি আর ইট, বালু ও পাথরের স্তুপে ভরা পদ্মাপাড় হয়ে দাড়িয়েছে এক অচেনা রূপ। কোটি মানুষের স্বপ্ন পূরণে বিশাল কর্মযজ্ঞ। তাই নির্মাণকাজ চলছে পুরোদমে।
আগামী ২০১৮ সালের মধ্যে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এ সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা। নিজস্ব অর্থায়নে এটি এ পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে বড় প্রকল্প। এর জন্য খরচ হবে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকা
এখন শুধু দক্ষিণ -পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষেরই নয় পুরো দেশবাসীর দৃষ্টি এখন স্বপ্নের পদ্মা সেতুর দিকে।
পদ্মা সেতুর মূল কাজের নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান মো. আবদুল কাদের বলেন, ইতিমধ্যে প্রকল্পের ২৭% কাজ হয়েছে। এর মধ্যে সেতুর কাজের ১৭.২৭%, নদীশাসন কাজের ১৩% এবং উভয় প্রান্তে সংযোগ সড়কের প্রায় ৬০%সম্পন্ন হয়েছে।
পদ্মা সেতুতে মোট পিলার থাকবে ৪২টি। এর মধ্যে ৪০টি পিলার থাকবে নদীর ভেতরের অংশে। দুটি থাকবে দুই প্রান্তে সংযোগ সেতুতে। নদীর ভেতরের ৪০টি পিলারের প্রতিটিতে ৬টি করে পাইল করা হবে। এ জন্য মোট ২৪০টি পাইল করতে হবে। সংযোগ সেতুর দুটি পাইলে ১২টি করে ২৪টি পাইল করতে হবে।
দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল পদ্মা সেতু। ১৯৯৮-৯৯ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসার পর ফেব্রুয়ারি মাসে পদ্মা সেতুর নকশার জন্য পরামর্শক নিয়োগ করা হয়। তবে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ২০১১ সালে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে সরে যায়।
তারপর সরকার নিজস্ব অর্থায়নে এ সেতু তৈরির উদ্যোগ নেয়। ২০১৪ সালের জুন মাসে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজের সঙ্গে এ সেতু নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং ২৬ নভেম্বর কার্যাদেশ দেয়া হয়।
এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ কর্তৃপক্ষ এ বছরের মার্চে চীনের প্রথামতো মাওয়ায় পদ্মার পাড়ে দুটি গরু, দুটি ছাগল ও দুটি মোরগ জবাই করে সেগুলোর রক্ত নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে নির্মাণকাজ শুরু করে।