শরীয়তপুরে জাজিরায় এবার কিশোর-কিশোরীর হাত-পা বেঁধে প্রকাশ্যে জুতাপেটা করার ঘটনা ঘটেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের উদ্ধৃত করে আমাদের সংবাদদাতা জানিয়েছেন, জুতার মালা গলায় পরিয়ে স্থানীয় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান লিয়াকত মল্লিকের নির্দেশে তাদের এ নির্যাতন চালানো হয়েছে। পরে, তাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ভিডিওচিত্র দেখে ঘটনাস্থলে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। তবে, এঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছে নির্যাতনকারী ইউপি মেম্বার কামাল মল্লিক।
অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয় শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কুন্ডেরচর ইউনিয়নের দুই কিশোর-কিশোরী। নির্যাতনের দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে আলোচনায় আসে বিষয়টি।
ভালোবেসে বিয়ে করার জন্য ৬ ফেব্রুয়ারি বাড়ি থেকে তারা পালিয়েছে এ অভিযোগে দুজনকে ধরে আনে স্থানীয় ইউপি মেম্বার কামাল মল্লিক। পরে, তাদের সারারাত বেঁধে রেখে করা হয় নির্যাতন। পরের দিন ৭ ফেব্রুয়ারি সালিশের নামে সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান লিয়াকত মল্লিকের নির্দেশে দড়ি দিয়ে হাত পা বেঁধে জুতা-পেটা করা হয় তাদের।
খালেদা ও জাহানারা নির্যাতিতদের মা দেশ টিভিকে বলেন, সাবেক এ চেয়ারম্যানের ভয়ে কেউই ওই দুই কিশোর-কিশোরীকে উদ্ধার করতে আসেনি।
নির্যাতনের পর থেকে ভীতসন্ত্রস্ত্র ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে রয়েছে স্বপন ও আইরিন।
তবে, তাদের কোনো ধরনের নির্যাতন করা হয়নি বলে দাবি নির্যাতক শরীয়তপুরের কুণ্ডেরচরের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান লিয়াকত মল্লিকের।
পরে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ আর এ ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছে নির্যাতনকারী ইউপি মেম্বার কামাল মল্লিক।
তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে জানান শরীয়তপুরের জাজিরা থানার উপ-পরিদর্শক সঞ্জয় কুমার।
আগে এবং পরের কথা:
বিদ্যালয়ের খোলা মাঠে এ কিশোরী ও কিশোরকে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়ায় শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলায় তোলপাড় হচ্ছে। ভিডিওতে দেখা যায়, ওই কিশোর-কিশোরীকে দড়ি দিয়ে হাত বেঁধে গলায় জুতার মালা পরিয়ে তিন ব্যক্তি জুতাপেটা করছে। ৬ মিনিট ৪২ সেকেন্ডের এ ভিডিও ক্লিপটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইউটিউব ও ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
দৃশ্যটি ধারণ করা হয় শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কুন্ডেরচর ইউনিয়নের ছিডারচর এলাকার কুন্ডেরচর আব্দুল মান্নান মল্লিক কান্দি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কুন্ডেরচর আব্দুল মান্নান মল্লিক কান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রীর সঙ্গে প্রতিবেশী এক কিশোরের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গত ৬ ফেব্রুয়ারি তারা দুজন বাড়ি থেকে পালিয়ে যাচ্ছিল। গ্রামের শেষ প্রান্তে নদীর ঘাট থেকে তাদের আটক করে কয়েকজন যুবক নিয়ে যায় কুন্ডেরচর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত মল্লিকের বাড়িতে। সেখানে লিয়াকত মল্লিকের নির্দেশে বাড়ির উঠানে তাদের শিকল দিয়ে বেঁধে রেখে রাতভর নির্যাতন চালানো হয়। পরদিন তাদের নেয়া হয় কুন্ডেরচর আব্দুল মান্নান মল্লিক কান্দি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। সেখানে দড়ি দিয়ে বেঁধে গলায় জুতার মালা পরানো হয়।
কুন্ডেরচর ইউপির তিন নম্বর ওয়ার্ড সদস্য কামাল মল্লিক, স্থানীয় আমীর হোসেন মল্লিক ও সুজন মল্লিক ওই কিশোর-কিশোরীকে জুতাপেটা করেন। হাত বাঁধা অবস্থায় তাদের বিদ্যালয়ের মাঠে ফেলে রেখে যায় নির্যাতনকারীরা। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা তাদের উদ্ধার করেন। এ ঘটনা কাউকে না জানানোর জন্য দুই পরিবারকে হুমকি দেয় কামাল মল্লিক। এমনকি তাদের চিকিৎসার জন্য গ্রামের বাইরে না নেয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়।
কিশোরীর ভাই জানান, তার বোন ছোট মানুষ, জীবন সম্পর্কে বোঝার মতো বয়স হয়নি। সে কোনো অন্যায় কাজ করলে অভিভাবকদের জানাতে পারত। কিন্তু তা না করে লিয়াকত মল্লিক ও কামাল মল্লিকের নেতৃত্বে প্রকাশ্যে তাদের নির্যাতন করেছে।
নির্যাতিত কিশোরের বাবা জানান, তারা গরিব মানুষ। ছেলে কৃষি শ্রমিকের কাজ করে। সে কোনো অন্যায় করলে অভিভাবক রয়েছে, দেশে আইন আছে। কিন্তু পূর্ব বিরোধের জের ধরে কামাল মল্লিকের নেতৃত্বে তাকে নির্যাতন করা হয়েছে। তিনি ঘটনা জাজিরা থানায় জানিয়েছিলেন। পুলিশ বলেছে, ঘটনা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কিন্তু পুলিশ আর আসেনি। এসেছে নির্যাতনের ঘটনার ভিডিও প্রচার হওয়ার পর।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নির্যাতিত কিশোরী জানায়, তাকে বেদম নির্যাতন করা হয়েছে। বিদ্যালয়ের মাঠে নির্যাতন চালানোর সময় তাকে বাঁচাতে কোনো শিক্ষক ও সহপাঠীও এগিয়ে আসেনি। সে চিৎকার করে সাহায্য চেয়েছে। সবাই দাঁড়িয়ে মজা দেখেছে। আমি তো কোনো অন্যায় করিনি। একটি ছেলেকে ভালবেসেছি। তাকে নিয়ে সংসার করতে চেয়েছিলাম। এখন আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে।
নির্যাতনের শিকার কিশোর জানায়, ছেড়ে দেয়ার জন্য পায়ে ধরেছি, তাতেও নির্যাতন করা বন্ধ করেনি তারা।
এদিকে পুলিশ ও গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে কামাল মল্লিক, আমীর হোসেন মল্লিক ও সুজন মল্লিক গ্রাম থেকে পালিয়ে গেছে। তাদের পরিবারের সদস্যরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
কুন্ডেরচর ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান লিয়াকত মল্লিক জানান, এ দুর্গম চরে প্রশাসনের লোক আসে না। তাকেই সামাজিক বিভিন্ন অন্যায়ের বিচার করতে হয়। ওই ছেলেমেয়ের বিরুদ্ধে অসামাজিক কাজ করার অভিযোগ ছিল। এ ঘটনার বিচারও তিনি করেছেন। ছেলেমেয়ের অভিভাবককে খবর দেয়া হয়েছিল। তারা উপস্থিত না হওয়াতে তাদের ছাড়াই বিচার করা হয়েছে। স্কুল মাঠে কারা তাদের জুতাপেটা করেছে, তা তার জানা নেই।
জাজিরা থানার এসআই সঞ্জয় কুমার সাহা জানান, কিশোর-কিশোরীকে নির্যাতনের ভিডিওটি থানায় আসার পর পুলিশ ওই চরে গিয়েছিল। ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। ক্ষতিগ্রস্তরা মামলা করলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।