মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধী বদর কমান্ডার মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকরের খবর চট্টগ্রামে ছড়িয়ে পড়লে উল্লাসে ফেটে পড়েন সর্বস্তরের মানুষ। ডালিম হোটেল এলাকায় উপস্থিত হয়ে উল্লাস প্রকাশ করেন অনেকে।
সাজা কার্যকরের খবরে প্রতিক্রিয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করে ডালিম হোটেলে নির্যাতনের শিকার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জসীমের বোন জানান ৪৫ বছরের পাথর নেমেছে তার বুক থেকে।
ডালিম হোটেলে নির্যাতনের শিকার সালাউদ্দিন খানের স্ত্রী নুরজাহান খান জানান মীর কাসেমের ফাঁসির মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি জাতি কলঙ্কমুক্ত হয়েছে।
মীর কাসেমের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী আপরাধ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের আরেক সাক্ষী নির্যাতিত মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ইলিয়াসও স্বস্তি প্রকাশ করেন মৃত্যুদন্ড কার্যকরে।
এদিকে, যুদ্ধাপরাধী আলবদর নেতা মীর কাশিম আলীর ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ময়মনসিংহসহ সারাদেশের মানুষ।
ফাঁসি কার্যকরের পরই ময়মনসিংহের মুক্তিযোদ্ধা, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিসহ বিশিষ্ট জনেরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। একে অপরকে মিষ্টি খাইয়ে উচ্ছ্বাসে মাতেন সবাই। পরে আনন্দ মিছিল বের করে সর্বস্তরের মানুষ। এসময়, স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা বলেন এই কুখ্যাত রাজাকারের ফাঁসির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জামাত ইসলামের মেরুদন্ড ভেঙ্গে গেছে। তারা অবিলম্বে বাকি যুদ্ধাপরাধীদেরও রায় কার্যকরের দাবি জানান। এছাড়া, রায় ঘোষণার পর রাস্তায় নেমে আনন্দ প্রকাশ করেছেন সারাদেশের সর্বস্তরের মানুষ।
কি হয়েছিল ডালিম হোটেলে
একাত্তরে চট্টগ্রামের ডালিম হোটেল ছিল বদর কমান্ডার মীর কাসেমের টর্চার সেল, কুখ্যাত হয়েছিল 'ডেথ ফ্যাক্টরি' হিসেবে। এখানেই নির্যাতন-হত্যার শিকার হয় মুক্তিযোদ্ধা জসিমসহ আরো অনেকে। নির্যাতনের পর কিশোর জসিমসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরো পাঁচজনকে হত্যা করে লাশ ফেলে দেয়া হয়েছিল কর্ণফুলী নদীতে।
সেই নির্যাতনের কথা উঠে এসেছে সাক্ষী ও স্বজনদের বর্ণনায়।
একাত্তরে ঈদ উল ফিতরের পরদিন চট্টগ্রামের দেওয়ানহাট এলাকায় মামাত বোন হাসিনা খাতুনের বাসা থেকে বের হওয়ার পর কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিমকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় ডালিম হোটেলে। পরে সেখানেই নির্যাতন শেষে জসিমকে হত্যা করা হয়। তার মৃতদেহেরও কোন সন্ধান পাননি স্বজনরা।
যুদ্ধের পর ডালিম হোটেলে নির্যাতনের শিকার অ্যাডভোকেট শফিউল আলমের কাছে স্বজনরা জানতে পারেন, জসিমকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল। তার মৃতদেহ নদীতে ফেলে দিয়েছিল আলবদর বাহিনী। জসিম হত্যার অভিযোগেই মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মীর কাসেমকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়।
২০০৬ সালে মারা যান শফিউল আলম। মুক্তির পর শফিউল আলম তার স্বজনদের জানিয়েছিলেন, কাসেম আলীর নেতৃত্বে ডালিম হোটেলে কি অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন বন্দিরা। খাবার পানিও জুটতো না তাদের।
মুক্তিযুদ্ধের সময় মীর কাসেমের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে ডালিম হোটেলসহ চারটি নির্যাতন কেন্দ্র তৈরি করেছিল আলবদর বাহিনী। জুলাইয়ের শেষদিকে নগরীর টেলিগ্রাফ রোডের বিজন মোহন নাথের তিনতলার মহামায়া ডালিম ভবনটি দখলে নিয়ে তৈরি করা হয় টর্চার সেল।
নির্যাতিতরা জানান, প্রতিদিনই নতুন নতুন বন্দিদের চোখ বেঁধে নিয়ে আসা হতো সেখানে। সেই টর্চার সেলে চোখ বন্ধ করেই বন্দিদের ওপর চালানো হতো নির্যাতন। আর মাঝে মাঝেই সেখানে যেতেন মীর কাসেম আলী।