গাজীপুরের টঙ্গীর বিসিক শিল্পনগরীতে টাম্পাকো ফয়লস লিমিটেডের পলি প্যাকেজিং কারখানায় আগুন লাগার নিয়ন্ত্রণে এনেছে দমকল বাহিনীর সদসদ্যরা। তবে আবারো ভবনটির চারতলায় আগুন দেখা গেছে বলে আমাদের সংবাদদাতা জানিয়েছেন।
এখনো ধ্বংসস্তুপ থেকে আরো ৬টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ৩১ জনে। আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। উদ্ধার কাজ এখনো চলছে।
তবে রোববার সকালেও চলে আগুন নেভোনোর কাজ। ভিতরের পোড়া ছাই গাদা থেকে এখনো কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে। প্রথমে বয়লার বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে ধারণা করা হলেও পরে জানা যায় গ্যাস লাইনের লিকেজ থেকেই গতকাল ভোরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে চারতলা ভবনের প্রায় পুরোটাই ধসে গেছে। সকালে আরো একজনসহ মারা গেছেন ২৬ জন। নিখোঁজদের সন্ধানে ভিড় করছেন স্বজনেরা। এদিকে নিখোঁদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।
আগুনে এ পর্যন্ত আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। প্রায় ৩০ ঘণ্টা পর কারখানার আগুন নিয়ন্ত্রণে এনেছে ফায়ার সার্ভিস।
শনিবার ভোর থেকে রাতভর ফায়ার সার্ভিসের ২৫ ইউনিটের প্রায় ১৫০ জন কর্মীকে আগুন নেভানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
টঙ্গী ফায়ার স্টেশনের মাস্টার সেলিম মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, এখনো মোট ২৫টি ইউনিট কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ভবনের মধ্যে প্রচুর কেমিক্যাল পদার্থ থাকায় আগুন নেভাতে সমস্যা হচ্ছে তবে নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
এ দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২৬ এ পৌঁছেছে।
দুর্ঘটনায় যারা নিহত হয়েছেন তাদের মধ্যে যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে: নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ঢাকার নবাবগঞ্জের গোপাল দাস (২৫), একই এলাকার ক্লিনার শংকর সরকার (৩৫), পিরোজপুরের আল মামুন (৪০), চাঁদপুরের মতলবের নিরাপত্তাকর্মী আবদুল হান্নান (৫০), কুড়িগ্রামের ইদ্রিস আলী (৪০), ভোলার দৌলতখান এলাকার নিরাপত্তাকর্মী জাহাঙ্গীর আলম (৬৫), টাঙ্গাইলের গোপালপুর এলাকার সুভাষ চন্দ্র (৩০), ময়মনসিংহের ত্রিশাল এলাকার রফিকুল ইসলাম (৪০), একই জেলার ঈশ্বরগঞ্জ এলাকার রিকশাচালক আবদুর রাশেদ (২৫), কারখানার শ্রমিক সিলেটের গোপালপুর এলাকার ওয়ালি হোসাইন (৪০), একই এলাকার মো. সোলায়মান (৩০), সাইদুর রহমান (৫১), মাইন উদ্দিন (২৯) ও এনামুল হক (৩৫), ত্রিশালের প্রকৌশলী আনিসুর রহমান (৪৫), পথচারী হবিগঞ্জের রোজিনা আক্তার (২০) ও তার ছোট বোন তাহমিনা আক্তার (১৮) ও শিশু মো. আশিক (১২)। এ ছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে দেলোয়ার হোসেন (৩৫), ওয়াহিদুজ্জামান (৪০) ও আনোয়ার হোসেনের (৩৫) নাম জানা গেছে। নিহত এক নারীসহ অন্যদের নাম জানা যায়নি।
তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে আসমা নামে এক তরুণীর কথা জানা গেছে যিনি দুর্ঘটনার সময় ওই রাস্তার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মারা যান।
তার বাড়ি ময়মনসিংহে।
রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গাজীপুরের টঙ্গিতে অবস্থিত কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
প্রধানমন্ত্রী নিহতদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।
তিনি আহতদের সুচিকিৎসার জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন বলে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে বাসস এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
গাজীপুরের সিভিল সার্জন আলী হায়দার খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এ ঘটনায় কমপক্ষে অর্ধশত জন আহত হন।
আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউনিট। ৪ তলা বিশিষ্ট ভবনটি ভেঙে পড়েছে।
কারখানাটিতে ফয়েল ও কেমিক্যাল–জাতীয় দ্রব্য প্রস্তুত করা হতো বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে।
গতকালই গাজীপুরের টঙ্গী বিসিক শিল্প নগরীতে কারখানায় বয়লার বিস্ফোরণে নিহত শ্রমিক পরিবারকে দুই লাখ টাকা দেয়ার কথা জানান শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু।
ঘটনা তদন্তে গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক পরিবারকে বিশ হাজার টাকা করে দেয়া হয়েছে।
সকাল ৬টার দিকে অগ্নিকাণ্ডে আহতদের টঙ্গী ৫০ শয্যার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ভোর ৬ টার দিকে ট্যামপাকো নামের একটি প্যাকেজিং কারখানার বয়লার বিস্ফোরিত হয়। এতে পুরো কারখানায় আগুন ধরে যায়। অগ্নিকাণ্ডে চার তলা একটি ভবনের একাংশ ধসে যায়। আগুন ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের এলাকায়। আগুন নিয়ন্ত্রণে টঙ্গী, জয়দেবপুর, কুর্মিটোলা, উত্তরাসহ ফায়ার সার্ভিসের আশেপাশের ২৫টি ইউনিট কাজ করে। কারখানাটিতে রাতের শিফটের কাজ চলছিল।
তদন্ত কমিটি:
ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিস এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) আনিস মাহমুদ বলেন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) মো. বদিউজ্জামানকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে ১০ কার্যদিবস সময় দেয়া হয়েছে।
এদিকে গাজীপুর জেলা প্রশাসক এস এম আলম বলেন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. রাহেনুল ইসলামকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে ১৫ কার্যদিবস সময় দেয়া হয়েছে।