গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম,লালমনিরহাট ও জামালপুরে মঙ্গলবার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে।
গাইবান্ধার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ৩৮ সে. মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এছাড়া ঘাঘট নদীর পানি ২১.৯৭ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে তিস্তা, যমুনা ও করতোয়া নদীর পানি এখনও বিপদসীমার নিচে রয়েছে।
অপরদিকে বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ায় জেলার সুন্দরগঞ্জ, সদর, ফুলছড়ি ও সাঘাটা উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। ৪ উপজেলার হাজার হাজার পরিবার এখন পানিবন্দি। ওইসব এলাকার নিম্ন ও চরাঞ্চলের রাস্তা-ঘাট, ফসলি জমি জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। দ্রুত পানি বৃদ্ধির কারণে নদী তীরবর্তী ও চরাঞ্চলের মানুষরা আতংকিত হয়ে পড়েছেন।
ইতোমধ্যে ফুলছড়ি উপজেলার ৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধসহ চরাঞ্চল বেষ্টিত ৫১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশপাশে বন্যার পানি উঠায় পাঠদান বন্ধ রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা সাঘাটার জুমারবাড়ি থেকে সুন্দরগঞ্জের তারাপুর পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বেশকিছু এলাকাকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করেছেন।
চিহ্নিত এলাকাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, সাঘাটার বসন্তের পাড়া, গোবিন্দ্রপুর, ফুলছড়ির রতনপুর, সিংড়িয়া, কাতলামারি, সদর উপজেলার কামারজানি, কাজলঢোপ, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছয়ঘড়িয়া, সাদুল্যাপুর উপজেলার কামারপাড়া।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান বলেন, বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রয়োজন অনুযায়ী অস্থায়ী প্রতিরক্ষামূলক কাজ করা হবে।
এ পর্যন্ত জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরিভাবে ১২৫ মে. টন চাল ও ১০ লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
কুড়িগ্রাম:
কুড়িগ্রামে সবগুলো নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি ১৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ও সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি ৫৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বেড়েছে তিস্তা ও দুধকুমার নদীর পানি।
বন্যা কবলিত হয়ে পড়েছে উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী, রাজিবপুর, নাগেশ্বরী ও সদর উপজেলার ৩৫টি ইউনিয়নের আড়াই শতাধিক গ্রাম। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এসব এলাকার প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ। বানভাসী মানুষজন ঘর-বাড়ি ছেড়ে বাধ ও উচু জায়গায় আশ্রয় নিতে শুরু করেছেন। এসব এলাকায় দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সংকট। বন্ধ রয়েছে জেলার দেড় শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান।
বন্যার্তদের জন্য জেলা প্রশাসন থেকে ২৫০ মেট্রিকটন চাল ও ৫ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।
স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি ১৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার ও সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি ৫৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
লালমনিরহাট:
দোয়ানী পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ১০ সে.মি ও কুলাঘাট পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ১২ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে
লালমনিরহাটের দোয়ানী পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি কমে বিপদসীমার ১০ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও দুর্ভোগ কমেনি নদীর ভাটি এলাকার পানিবন্দি মানুষের।
এখনো পানিবন্দি রয়েছেন জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার সিন্দুরনা, ডাউয়াবাড়ি, গড্ডীমারী, পাটিকাপাড়া, চর গড্ডীমারী; কালীগঞ্জ উপজেলার কালিকাপুর, চর বৈরাতী; আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচা, গোবর্ধন, কুটির পার ও সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর, মোগলহাট, কুলাঘাটসহ নদী তীরবর্তী ১২টি ইউনিয়নের ৩৮টি গ্রামের মানুষ।
এসব এলাকায় তলিয়ে গেছে বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও স্কুল কলেজ। দুর্ভোগ বেড়েছে পানিবন্দিদের।
দুর্গত এলাকায় দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানি ও তীব্র খাদ্য সংকট। তবে পানি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ডালিয়া ব্যারাজের সবকটি জলকপাট খুলে দিয়েছে পাউবো কর্তৃপক্ষ।
এছাড়াও ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১২ সে.মি উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে ভয়াবহ ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে সদর উপজেলার কুলাঘাট ইউনিয়নের শিবের কুটি গ্রামে। হুমকির মুখে পড়েছে শহর রক্ষাবাধ। নতুন করে প্লাবিত হয়েছে নদী তীরবর্তী নিম্নাঞ্চল।
এদিকে, পানিবন্দিদের মাঝে সরকারিভাবে কিছু ত্রাণ বিতরণ করা হলেও তা অনেকের কাছে পৌঁছেনি বলে দাবি ভূক্তভোগীদের।
যদিও লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক আবুল ফয়েজ মো. আলাউদ্দিন খাঁন পর্যাপ্ত ত্রাণ সামগ্রী মজুদের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুত জেলা প্রশাসন।
জামালপুর:
যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ৪০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ১০৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জামালপুরের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি বিপদসীমার ৪০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
সকালে বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে বিপদসীমার ৪০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। এতে জামালপুর সদর, ইসলামপুর, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ, দেওয়ানগঞ্জ ও সরিষাবাড়ি উপজেলার যমুনা ছাড়াও ব্রক্ষ্মপুত্র, ঝিনাইসহ শাখা নদীগুলোর পানিও বাড়তে শুরু করেছে। ফলে প্রায় ২৫ টি ইউনিয়নের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানি ও শুকনো খাবার ও গো খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে।
অপরদিকে পানি উঠে পড়ায় জেলার ১০৩টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। দুর্গত এলাকায় ৭৯টি মেডিকেল টিম কাজ করছে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যা কবলিত এলাকায় এ পর্যন্ত ৮০ মেট্রিকটন চাল ও নগদ ৮০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। দুর্গত এলাকায় যে ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।