আবারো দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বন্যা শুরু হয়েছে।
টানা বৃষ্টি আর উজানের ঢলে সুরমা, তিস্তা ও যমুনা নদীর পানি বেড়ে আবারও বিপদসীমার ওপরে। রংপুর, বগুড়া, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, লালমনিরহাট, গাইবান্ধা, পঞ্চগড়, দিনাজপুর, শেরপুর, ঠাকুরগাঁও, নেত্রকোনা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারীসহ বেশকিছু এলাকার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে।
এতে নতুন করে দুর্ভোগে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। ভেসে গেছে ফসল ও পুকুরের মাছ।
লালমনিরহাট:
রোববার লালমনিরহাটের দোয়ানী পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ৬৫ সে.মি. ও কুলাঘাট পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ১০৮ সে. মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে ৬টি বাধ বিধ্বস্ত, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাধগুলোর উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
ভারি বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢলে লালমনিরহাটে বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে।
সকাল থেকে দোয়ানী পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ৬৫ সে. মি. ও কুলাঘাট পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ১০৮ সে. মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ব্যারেজ এলাকায় মাইকিং করে লোকজনদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে প্রশাসন।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকেও রেডএলার্ট জারি করা হয়েছে।
এরইমধ্যে ব্যারেজ এলাকার ভাটিতে ২০০ মিটার বাধ, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোঁচার বালুর বাধ, সদর উপজেলার কুলাঘাট শহর রক্ষা বাধ, ইটাপোতা, শীবেরকুটিবাধসহ মোট ৬টি বাধ বিধ্বস্ত হয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাধগুলোর উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় হাতীবান্ধা, পাটগ্রাম উপজেলা শহর, লালমনিরহাট জেলা শহরে পানি ঢুকে পড়েছে। বন্যায় ৫ উপজেলার ৩২টি ইউনিয়নের অর্ধশত গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ।
তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, স্কুল, কলেজ, মসজিদ মাদরাসাসহ অসংখ্য স্থাপনা।
পানি নিয়ন্ত্রণে ডালিয়া ব্যারাজের সবকটি গেট খুলে দিয়েছে পাউবো কর্তৃপক্ষ। ঝুঁকির মুখে রয়েছে তিস্তা ব্যারেজ।
সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে জেলার ১৪৩টি বিদ্যালয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে শুকনো খাবার ও বিশুদ্ধ পানি তীব্র সংকট দেখা দেয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন দুর্গোত এলাকার মানুষজন।
দুর্গোত এলাকায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুকনো খাবার ও ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হলেও তা পর্যাপ্ত নয় বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।
তবে পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলা প্রশাসন প্রস্তুত আছে বলে জানিয়েছেন লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক শফিউল আরিফ।
এদিকে, বন্যার কারণে ৬০০ ভারতীয় নাগরিক লালমনিরহাটের মোগলহাট সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয় নেয়ার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়াও লালমনিরহাট-বুড়িমারী রেললাইনের উপর পানি উঠে পড়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ রয়েছে।
কুড়িগ্রাম:
কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র ও ধরলা, তিস্তা ও দুধকুমারসহ সবগুলো নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। সেতু পয়েন্টে ধরলার পানি বিপদসীমার ১০৮ সেন্টিমিটার, চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানি বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার এবং পাটেশ্বরী পয়েন্টে দুধকুমারের পানি বিপদসীমার ১৩৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
রাজারজাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের কালুয়ারচরে বাঁধ ভেঙে এক নারী শিশুসহ নিখোঁজ হয়েছে।
পানিবন্দি হয়ে পড়েছে জেলার রৌমারী, রাজিবপুর, চিলমারী, উলিপুর, নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ী ও সদর উপজেলার ৫৪ ইউনিয়নের প্রায় দেড় লক্ষাধিক মানুষ। তলিয়ে গেছে ২৫ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ক্ষেত তলিয়ে গেছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিচ্ছে বন্যা কবলিত মানুষজন।
কুড়িগ্রাম-ভুরুঙ্গামারী সড়ক তলিয়ে যাওয়ার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে নাগেশ্বরী, ভুরুঙ্গামারী ও ফুলবাড়ী উপজেলাসহ সোনাহাট স্থল বন্দরের যোগাযোগ ব্যবস্থা।
পানির তীব্র স্রোতে সদরের আরডিআরএস বাজারে ৩০ মিটার ও ফুলবাড়ী উপজেলার গোড়কমণ্ডলে ১৫ মিটার বাঁধ ভেঙে নতুন করে ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এসব এলাকার মানুষজন সংশ্লিষ্ট এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সমূহে আশ্রয় নিয়েছে।
বন্যার পানি উঠায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে জেলার দুই শতাধিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয় পানি উন্নয়ন বিভাগ জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে ৮৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ১০৮ সেন্টিমিটার ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি চিলমারী পয়েন্টে ৫৮ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার ২০ সেন্টিমিটার এবং পাটেশ্বরী পয়েন্টে দুধকুমারের পানি বিপদসীমার ১৩৮ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া তিস্তাসহ অন্যান্য ১৩টি নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।
জামালপুর:
উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও টানা ভারি বর্ষণে জামালপুরে ২য় দফায় বন্যা দেখা দিয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে আজ সকালে বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে বিপদসীমার ৫৮সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
গত দুই দিনে যমুনার পানি বৃদ্ধিতে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ ও ইসলামপুর উপজেলার আভ্যন্তরীণ নদী-নালা ও খাল-বিল ভরে অসংখ্য বাড়িঘরে পানি উঠেছে। ইতোমধ্যেই জেলার ইসলামপুরের চিনাডুলি, বেলগাছা, সাপধরী, নোয়ারপাড়া, কুলকান্দি, পাথর্শী এবং দেওয়ানগঞ্জের চুকাইবাড়ী ইউনিয়ন সমূহের প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ওইসব এলাকার গ্রামীণ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ও বিদ্যালয়গুলোতে পানি উঠায় ব্যাহত হচ্ছে ২য় সাময়িক পরীক্ষা ও পাঠদান। এদিকে, বন্যা মোকাবিলায় প্রশাসনের সকল ধরনের প্রস্তুস্তির কথা জানিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
ঠাকুরগাঁও:
গত দুই দিনের অবিরাম ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে তলিয়ে গেছে ঠাকুরগাঁওয়ের ৫ উপজেলার কয়েক হাজার ঘর-বাড়ি।
শনিবার ভোর থেকে হঠাৎ প্রবল বৃষ্টির কারণে প্লাবিত ঘর-বাড়িতে প্রায় ৩ শতাধিক মানুষ আটকে পড়েছে। ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় লোকজন এখন পর্যন্ত শতাধিক মানুষকে উদ্ধার করেছে বলে জেলা প্রশাসন জানিয়েছে।
জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা বাড়িতে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার কাজে অব্যাহত রয়েছে।
প্লাবিত এলাকায় মানুষজন বিপাকে পড়েছেন— অনেকে রাস্তায় পাশে গবাদি পশুসহ আশ্রয় নিয়েছেন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ঠাকুরগাঁও শহরের আশেপাশের কয়েকশ পরিবারকে উঁচু ও নিরাপদ ৮টি স্থানে আশ্রয় স্থানে নেয়া হয়েছে।
শহরের প্লাবিত এলাকাগুলো হলো: হঠাৎপাড়া, ডিসি বস্তি, সরকার পাড়া, খালপাড়া, সদর উপজেলার আকঁচা, রায়পুর, মোহাম্মদপুর, সালন্দর, শুকানপুকুরী ও বালিয়াডাঙ্গী ও রাণীংশকৈল উপজেলা।
জেলার বিভিন্ন নদীর পানি বিপদ সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। টাঙ্গন নদীর পানি বিপদ সীমার ৪০ সে.মি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
মৌলভীবাজার:
মৌলভীবাজারের মনু নদী মনু রেলব্রিজ পয়েন্টে ৪০ সেন্টিমিটার ও চাঁদনীঘাট ব্রিজ পয়েন্টে ২০ সেন্টিমিটার বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া জেলার বড়লেখা, জুড়ি, কুলাউড়া এবং হাওর কাউয়াদীঘির মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলার দুই শতাধিক গ্রাম থেকে গত সাড়ে চার মাসে নিমজ্জিত অংশ থেকে সম্পূর্ণ পানি নেমে যায়নি।
গত দুদিনের ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে নিমজ্জিত বাড়িঘর ও রাস্তাঘাটে পানি বেড়ে বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হয়েছে। পানিবন্দি এসব এলাকার লাখ লাখ মানুষের ভোগান্তি পুনরায় বৃদ্ধি পেয়েছে। নৌকা ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়ার কোনো উপায় নেই। জেলার জন্য বরাদ্ধকৃত চাল ও নগদ অর্থ শেষ হয়ে যাওয়ায় সরকারি ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কাজ বন্ধ থাকায় ঘরে ঘরে খাবার সংকট দেখা দিয়েছে। বানভাসি মানুষ অনাহারে দিন যাপন করছেন। পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় মানুষের কষ্টের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।