একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কারাদণ্ড হওয়ায় তিনটি আসনেই বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
সকালে ফেনী-১ আসন ও দুপুরে ‘জিয়া পরিবারের আসন’ হিসেবে পরিচিত বগুড়া-৬ (সদর) ও বগুড়া-৭ আসনে তার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। এর মধ্যে বগুড়া-৭ আসনে খালেদা জিয়ার বিকল্প প্রার্থী মোরশেদ মিল্টনেরও মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। তবে বাকি দুটো আসনে খালেদা জিয়ার বিকল্প প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
মামলায় সাজার বিষয়টি উল্লেখ করে বগুড়া-৬ ও ৭ আসনে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করেন বগুড়ার রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক ফয়েজ আহাম্মদ। বগুড়া-৬ আসনে বগুড়া পৌরসভার মেয়রের পদ থেকে পদত্যাগ না করায় খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা এ কে এম মাহবুবুর রহমানের মনোনয়নও বাতিল হয়েছে। তবে ওই আসনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি রেজাউল করিম বাদশার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিলের আশঙ্কায় ওই সব আসনে বিএনপির একাধিক প্রার্থীকে বিকল্প হিসেবে দলীয় মনোনয়ন দেয়া হয়।
রিটার্নিং কর্মকর্তা ফয়েজ আহাম্মদ বলেন, বগুড়া-৬ ও ৭ আসনে মনোনয়ন দাখিল করেছিলেন খালেদা জিয়া। দুর্নীতি মামলায় তার দণ্ড হয়েছে এবং তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। আইন অনুযায়ী ফৌজদারি অপরাধে দুই বছর বা তার বেশি সাজা হলে দণ্ডিত ব্যক্তি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না । এ কারণে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা ও বগুড়া পৌরসভার মেয়র এ কে এম মাহবুবুর রহমান বলেন, বগুড়া-৬ ও ৭ আসন জিয়া পরিবারের। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সালের নির্বাচন পর্যন্ত এসব আসনে বিএনপির সঙ্গে কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেনি। এবারও দুটি আসনে ধানের শীষের প্রার্থী হওয়ার জন্য দলের চেয়ারপারসন মনোনয়ন দাখিল করেন। কিন্তু চেয়ারপারসনকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে সরকার অনেক আগে থেকেই নানা ষড়যন্ত্র ও কুট কৌশল চালিয়ে আসছে। সেই ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সাজানো মামলায় দণ্ড দিয়ে কারাবন্দী করে রাখা হয়েছে।
খালেদা জিয়া কারাগারে থাকলেও তাকে তিনটি আসনে প্রার্থী করে বিএনপি। আসনগুলো হলো ফেনী-১ এবং বগুড়া-৬ ও ৭।
বগুড়া-৬ আসনে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি থেকে সাংসদ হন সাবেক অর্থ প্রতিমন্ত্রী মুজিবর রহমান। ১৯৯৬ সাল থেকে প্রতিবারই এখানে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন খালেদা জিয়া। প্রতিবারই বিপুল ভোটে তিনি জয় লাভ করেন। পরে আসনটি ছেড়ে দিলে উপনির্বাচনে প্রার্থী হন সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার।
এ আসনে মনোনয়ন বাছাই শেষে এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির বর্তমান সাংসদ নূরুল ইসলাম ওমর, বাম গণতান্ত্রিক জোট থেকে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) জেলা কমিটির সম্পাদক আমিনুল ফরিদ, ইসলামী আন্দোলনের আবু নোমান মোহাম্মদ মামুনুর রশীদসহ অন্যদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
বগুড়া-৭ আসনের গাবতলী উপজেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জন্মভিটা। এ আসনে ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সালের নির্বাচন পর্যন্ত প্রার্থী ছিলেন খালেদা জিয়া। তবে প্রতিবারই তিনি আসনটি ছেড়ে দিলে উপনির্বাচন হয়েছে। তিনটি উপনির্বাচনে ধানের শীষে প্রার্থী হয়ে সাংসদ হন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা হেলালুজ্জামান তালুকদার। ২০০৮ সালে আসনটি ছেড়ে দেওয়ার পর উপনির্বাচনে প্রার্থী হন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ।
এবারের নির্বাচনে খালেদা জিয়ার মনোনয়ন বাতিল হওয়ার আশঙ্কায় এ আসনে বিকল্প প্রার্থী করা হয় গাবতলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মোরশেদ মিলটনকে। তবে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে তিনি পদত্যাগ করেননি উল্লেখ করে তার মনোনয়নপত্রও বাতিল করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
মোরশেদ মিল্টন জানিয়েছেন, তিনি পদত্যাগ করে কাগজপত্র স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন আগেই। তবে রিটার্নিং কর্মকর্তা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন—এমন কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি মোরশেদ মিল্টন।
মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার বিরুদ্ধে মোরশেদ মিল্টন নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল করবেন বলে জানিয়েছেন।
ওই আসনে জাপার বর্তমান সাংসদ মুহাম্মদ আলতাফ আলীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে বগুড়া-৬ আসনে জাকের পার্টির ফয়সাল বিন শফিক এবং বগুড়া-৭ আসনে জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) জেলা সভাপতি মোস্তফা আলমের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তিনি আওয়ামী লীগের হয়ে মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও তাঁর দলীয় মনোনয়ন না থাকায় তা বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
এদিকে, ফেনী-১ আসনে দুর্নীতি মামলায় দণ্ড হওয়ায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। রোববার রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদ উজ জামান বলেন, দুটি মামলায় খালেদা জিয়ার সাজা হওয়ায় ফেনী ১ আসনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।
খালেদা জিয়া ছাড়াও ওই আসনে বিএনপির আরেক প্রার্থী ও দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। ওই আসনে ১০ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র চূড়ান্ত করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
মো. ওয়াহিদ উজ জামান মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের নির্ধারিত দিনে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্রের ব্যাপারে শুনানিতে পক্ষ-বিপক্ষের বক্তব্য শোনেন।
খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্রের তথ্য সঠিক হলেও পুলিশ তার বিরুদ্ধে দুটি মামলায় সাজার কথা উল্লেখ করে। এ সময় খালেদা জিয়ার পক্ষে ফেনী জেলা বিএনপির সভাপতি ও আইনজীবী আবু তাহের যুক্তি দেন যে, আপিল বিভাগে মামলা দুটি বিচারাধীন আছে। শুনানি শেষে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
পরে আবু তাহের বলেন, তারা মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে আপিল করবেন।
আসনটিতে আরও যাদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে তারা হলেন: ছাগলনাইয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি নূর আহম্মদ মজুমদার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মিজানুর রহমান ও আবুল বাশার চৌধুরী।
যে ১০ জনের মনোনয়নপত্র চূড়ান্ত করা হয়েছে, তারা হলেন—জাসদের শিরীন আখতার, বিএনপির রফিকুল আলম মজনু, ইসলামী আন্দোলনের কাজী গোলাম কিবরিয়া, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট-বিএনএফের শাহরিয়ার ইকবাল, গণফোরামের এবিএম গোলাম মাওলা চৌধুরী, খেলাফত আন্দোলনের আনোয়ার উল্লাহ ভুঁইয়া, স্বতন্ত্র প্রার্থী (আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী) শেখ আবদুল্লাহ ও খায়রুল বাশার মজুমদার, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের তারেকুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের কাজী নুরুল আলম।
গত ৮ ফেব্রুয়ারিতে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৫ বছরের কারাদণ্ড হয় খালেদা জিয়ার। গত ২৯ অক্টোবর জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়ার সাত বছরের কারাদণ্ড হয়। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাজা কমানোর আবেদন খারিজ করে গত ৩০ অক্টোবর খালেদা জিয়ার সাজা বাড়িয়ে ১০ বছর করে হাইকোর্ট।