অর্থের কাছে হার মানতে হলো এক দুর্ভাগা মায়ের। দাবি ছেড়ে দিতে হলো নিজ সন্তানের। চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় ঘটেছে এমন এক হৃদয় বিদারক ঘটনা। সন্তান হারিয়ে মা এখন পাগল প্রায়।
নাড়ি কাটা ধনকে ফিরে পেতে সমাজের বিত্তবান ও সরকারের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ানোর আকুতি জানিয়েছেন ওই মা।
অসহায় ওই মায়ের নাম তামান্না বেগম। গণমাধ্যমের প্রতি আকুতি জানিয়ে তিনি বলেন, হাসপাতালে অপারেশনের পরপরই টাকা চায়। আমি গরিব মানুষ টাকা দেব কোথা থেকে? একজন আমাকে বিনামূল্যে রক্ত দিলেও হাসপাতালে রক্তের বিল দুই হাজার টাকা নেয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে অপারেশন ওষুধ এবং আনুষাঙ্গিকসহ প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ হয়।
যখন হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে পারছিলাম না তখনই সন্তান বিক্রি করতে বাধ্য হই। যদিও এর আগে কাউসার নামে একজন সন্তান বিক্রি করব কীনা আমার কাছে জানতে চায়।
চাঁদপুর মতলব উত্তর উপজেলার ছেংগারচর পৌরসভা ১নং ওয়ার্ডের বারোআনি এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকেন তামান্না বেগম (২৮)। ৫ বছর আগে তার বিয়ে হয় পাশের হানির পাড় গ্রামের তৈয়ব আলীর ছেলে আলমের সঙ্গে।
শ্বশুরবাড়ির লোকজন মেনে না নেয়ায় ভাড়া বাসায় থাকেন তারা। দুই সন্তানের জননী তিনি। স্বামীও ঠিকমতো তাদের দেখভাল করেন না বলে জানান অসহায় মা।
সর্বশেষ তৃতীয় সন্তানের ডেলিভারির সময় হয়ে এলে স্বামী আলম টাকা জোগাড় করতে না পেরে চলে যান। কয়েকদিন বাসায়ও আসেননি। বন্ধ করে রাখেন মোবাইল ফোন। এর মধ্যেই তামান্না বেগমের প্রসব বেদনা উঠলে তার মা ও স্বজনরা মিলে ভর্তি করান স্থানীয় পালস এইড হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে। প্রথমে ঋণ করে হাসপাতালে ভর্তি হয় সেখানে। সন্তান প্রসব করলেও মুখ দেখা হয়নি তামান্নার।
হাসপাতালে সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে একটি ফুটফুটে ছেলে সন্তান জন্ম নিলেও শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে না পারায় নিজ সন্তানকে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেন তিনি।
ছেলেকে বিক্রি করলেও অবুঝ মায়ের মন সন্তানের জন্য কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে তাকে। তার ওপর স্বামী আলম বাড়িতে এসে তার সন্তানকে ফিরিয়ে দিতে চাপ প্রয়োগ করছে বলেও জানান তিনি তামান্না।
পরবর্তীতে হাসপাতালে একজনের সঙ্গে কথা বলে ৫০ হাজার টাকায় আমার নবজাতক শিশুকে বিক্রি করে দেই। কিন্তু এখন আমার স্বামী আমাকে তার সন্তান দেওয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। তা না হলে আমার সঙ্গে আর সংসার করবে না বলেও আমাকে হুমকি দিয়েছে। তখন টাকার জন্য সন্তানকে বিক্রি করলেও এখন আমার সন্তানের জন্য কষ্ট হয়। আমি আমার সন্তানকে ফিরে পেতে চাই।
জানি না আমি আমার সন্তানকে পাবো কীনা। কারণ তারা আমার কাছ থেকে স্ট্যাম্প করেছে এ সন্তান আমি আর কোনোদিন দাবি করতে পারব না। তার ওপর ৫০ হাজার টাকা আমার মতো গরিব মানুষ কীভাবে তাদেরকে দেবে। জানি না আমার সন্তান এখন কোথায় আছে বা কেমন আছে।
এ বিষয়ে হাসপাতালের মালিক প্রতিনিধি লিমন সরকার সাংবাদিকদের বলেন, বাচ্চা বিক্রির বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কিছুই জানে না। তারা আমাদেরকে বিশেষ কিছু জানায়নি। সর্বশেষ গত দুইদিন আগে যখন তিনি অপারেশনের সেলাই কাটতে আসেন তখনও আমরা তার বাচ্চা কেমন আছে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জানান বাচ্চা ভালো আছে।
এ বিষয়ে মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গাজী শরিফুল হাসান বলেন, আমি সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিষয়টি অবগত হয়েছি। এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে কেউ কোনো আবেদন করেনি। আমি খোঁজ নিচ্ছি। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করব।