আলু উৎপাদনে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম জেলা জয়পুরহাট। এবারও আলুর ফলন হয়েছে ভালো। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি হচ্ছে বিদেশেও। এছাড়া মাঝখানে আলুর দাম কিছুটা কম থাকলেও পরে দাম বাড়ায় লাভবানও হয়েছেন কৃষকরা।
জানা গেছে, কৃষি নির্ভর জেলা জয়পুরহাটের মোট কৃষিজমির ৮০ শতাংশেই আলুর চাষ হয়। এবার জেলায় ৪০ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। জেলার পাঁচ উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলু উৎপাদন হয় কালাই উপজেলায়। কালাই পৌরসভাসহ উপজেলার মাত্রাই, উদয়পুর, পুনট, জিন্দারপুর ও আহম্মেদাবাদ ইউনিয়নে চলতি মৌসুমে ১০ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও ২০০ হেক্টর জমিতে অতিরিক্ত চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ১০ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে উফশি জাতের আলু এবং ৩৫০ হেক্টর জমিতে স্থানীয় পাকড়ী জাতের আলু চাষ হয়েছে। জেলায় আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৯ লাখ ৯০ হাজার ৮৮৩ মেট্রিক টন ধরা হলেও তা ছাড়িয়ে গেছে।
আলু উৎপাদনের জন্য এবার কৃষকদের জমি লিজসহ, বীজ, জমি চাষ, সার-ওষুধ, সেচ, নিড়ানি, বাঁধাই, আলু উত্তোলনসহ প্রতি বিঘা (৩৩ শতক) জমিতে খরচ হয়েছে (আলুর জাতভেদে) ১৮/২৫ হাজার টাকা। আলুর জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে, মিউজিকা, ডায়মন্ড, এস্টোরিক্স, কার্ডিনাল, রোজেটা, ক্যারেজ, স্থানীয় পাকড়ী জাতের তেল-পাকড়ী, পাহাড়ী-পাকড়ী, বট-পাকড়ী ও ফাটা-পাকড়ী। তবে বেশি চাষ হয়েছে মিউজিকা, ডায়মন্ড, এস্টোরিক্স, কার্ডিনাল, ও রোজেটা।
এই আলু স্থানীয়ভাবে চাহিদা মিটিয়ে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, খুলনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, বরিশাল, ভোলা, নোয়াখালী, গোপালগঞ্জ, ফেনী ও চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
এছাড়াও কালাইয়ের উৎপাদিত আলু যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে। এরই মধ্যে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, কুয়েত ও রাশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানি শুরু হয়েছে।
কালাই উপজেলার ১০ থেকে ১৫টি স্থান থেকে প্রতিদিন প্রায় ৪-৫ হাজার মণ বিভিন্ন জাতের আলু কিনছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন মাঠ থেকে রপ্তানিকারকদের প্রতিনিধিরা পরিপক্ক আলু সংগ্রহ করে তা বাছাই করে নেটের হলুদ প্যাকেটে প্যাকেটজাত করছেন। এখানকার আলু বিদেশে রপ্তানি হওয়ায় বাজারে আলুর চাহিদা অনেক বেড়ে গেছে। আলুর ভালো দাম পাওয়ায় স্থানীয় চাষিদের মুখে হাসি ফুটেছে।
কালাই উপজেলার আপলাপাড়া গ্রামের আলুচাষী আনোয়ার বলেন, ৮ বিঘা জমিতে এস্টোরিক্স ও কার্ডিনাল জাতের আলু চাষ করেছি। বিঘা প্রতি আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ১৮ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় আলু পেয়েছি প্রায় ১০০ মণ। বিদেশি এক কোম্পানির এজেন্টের কাছে ওইসব আলু বিক্রি করেছি। সব খরচ বাদ দিয়ে বর্তমানে আলুর বাজার দর অনুযায়ী প্রতি বিঘায় লাভ হয়েছে প্রায় ২০ হাজার টাকা।
কালাই উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের আলুচাষি রাজ্জাক বলেন, মালয়েশিয়ার মাসাওয়া কোম্পানির এজেন্টের কাছে প্রতি মণ ৫৩০ টাকা দরে দুই বিঘা জমির মিউজিকা জাতের আলু বিক্রি করেছি। এবার বাজারে আলুর দাম ভালো পাওয়ায় অনেক খুশি হয়েছি।
কালাই উপজেলার নান্দাইলদীঘি গ্রামের বাসিন্দা ও মালয়েশিয়ার মাসাওয়া কোম্পানির আলু কেনার এজেন্ট বাশেদ ও রফিকুল বলেন, মালয়েশিয়ার মাসাওয়া কোম্পানির চাহিদা অনুযায়ী প্রতিদিন ১৩ টাকা কেজি দরে প্রায় ৪০০ মণ বিভিন্ন জাতের আলু কিনতে হচ্ছে।
কালাই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নীলিমা জাহান বলেন, এবার আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় আলুর বাম্পার ফলন হয়েছে। আলুর মান ভালো করতে আমরা প্রতিনিয়ত কৃষকদের পরামর্শ দিয়েছি। কৃষকরা যাতে ভালো ফলন পান সে বিষয়ে সার্বক্ষণিক নজর রাখা হয়েছে। আলুর দাম ভালো পেয়ে কৃষকরা অনেক খুশি। কৃষকদের আলু ক্ষেতে কীটনাশক স্প্রে না করে হাইজেনিক পদ্ধতিতে আলু চাষ করতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। হাইজেনিক পদ্ধতিতে আলু চাষ করলে প্রতি বছর বিদেশিদের কাছে চাহিদা বাড়তেই থাকবে। কারণ বিদেশীরা কীটনাশক স্প্রে করা আলু নিতে অনেক সময় অনাগ্রহী হয়ে পড়েন।
জয়পুরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, গত বছরগুলোর তুলনায় এবার বিদেশে আলুর চাহিদা বেড়েছে। আলু পাঠাতে কৃষি বিভাগ যদিও রপ্তানিকারকদের সাথে যুক্ত নন, তারপরও পরামর্শসহ সহযোগীতা করে আসছেন, যাতে করে দেশের আলু পৃথিবীর সকল দেশে রপ্তানি করতে পারেন তারা।