সুনামগঞ্জে এবারের ভয়াবহ বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মানুষের ঘরবাড়ির। এর আগে কোনো বন্যায় এত ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়নি। এতে শ্রমজীবী, দরিদ্র মানুষেরা চরম বিপাকে পড়েছেন। বন্যার পানি কমলেও বাড়িঘর বিধ্বস্ত হওয়ায় এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ নিজের ভিটায় ফিরতে পারছেন না।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১১টি উপজেলা ও ৪টি পৌরসভায় ক্ষতিগ্রস্ত বসতঘরের সংখ্যা ৪৫ হাজার ২৮৮টি। এর মধ্যে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে ৪ হাজার ৭৪৭টি। আংশিক ক্ষতি হয়েছে ৪০ হাজার ৫৪১টির।
সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন গতকাল বুধবার সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো জেলার বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি ও ত্রাণ তৎপরতা-সম্পর্কিত এক প্রতিবেদনে এসব উল্লেখ করেছেন। তবে বন্যা পুরোপুরি কমে গেলে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হবে বলে জানান তিনি।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, আগামী সপ্তাহে আমরা বরাদ্দ পাবো এবং ঘরবাড়ি সংস্কারে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সরকারি সহায়তা দেওয়া শুরু করবো।
সোমবার (৪ জুলাই) সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও এখনো বিভিন্ন উপজেলায় মানুষের বাড়িঘর, রাস্তাঘাটে বন্যার পানি আছে। পানি কিছুটা কমলেও অনেক মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বাড়িঘরে ফিরতে পারছেন না। অনেকের বাড়িঘর বন্যায় মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বন্যার পানির তোড়ে ভেঙে গেছে সেতুর সংযোগ সড়ক। এতে সুনামগঞ্জ শহরের সঙ্গে সরাসরি যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। ভাঙা স্থানে সাঁকো দিয়ে চলাচল করছে মানুষ।
সুনামগঞ্জ-সিলেট সড়কের বিভিন্ন স্থানে ভাঙন ও ধস দেখা দিয়েছে। অনেক স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেতু। টানা চারদিন সুনামগঞ্জ সারা দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। গ্রামীণ সড়কগুলো ভেঙে আছে। প্রাথমিকভাবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ২ হাজার কিলোমিটার এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগ ১৮৪ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে। টাকার অঙ্কে এই ক্ষতি ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ওপরে। সড়কের ক্ষতি আরও বাড়বে।
বন্যায় সুনামগঞ্জে সব ব্যবসায়ী কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এখনো বাজারে পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। বেচাকেনা জমে ওঠেনি। বন্যার্ত মানুষ সংকটে থাকায় লেনদেন অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা।
সুনামগঞ্জ শিল্প ও বণিক সমিতির সভাপতি খায়রুল হুদা (চপল) গণমাধ্যমকে বলেন, সুনামগঞ্জে এর আগে এত ব্যাপক বন্যা কখনো হয়নি। এবারের মতো অর্থনীতিতে এতটা প্রভাব পড়েনি। লেনদেন অস্বাভাকিভাবে কমে গেছে। এখনো পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।
সুনামগঞ্জের মানুষের একটা বড় অংশ মাছ ধরা ও মাছ চাষে যুক্ত। জেলায় ২৫ হাজার ১৭৩টি পুকুর আছে। সব কটি ভেসে গেছে বানের পানিতে। মাছচাষি আছেন ১৬ হাজার ৫০০ জন। ভেসে যাওয়া মাছের পরিমাণ ৩০ হাজার মেট্রিক টন, পোনা ভেসে গেছে প্রায় ১০ কোটি। এ ছাড়া খামারের অবকাঠামোগত ক্ষতিও হয়েছে। সব মিলিয়ে ক্ষতি হয়েছে এক হাজার কোটি টাকার।
এবার সুনামগঞ্জে তিন দফা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হাওরের কৃষক। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এপ্রিল মাসে পাহাড়ি ঢলে ছয় হাজার হেক্টর বোরো, দ্বিতীয় দফা মে মাসের মাঝামাঝি বন্যায় আরও প্রায় এক হাজার হেক্টর বোরো এবং সর্বশেষ এই বন্যায় ১১ হাজার ৪০৩ হেক্টর আউশ ধানের ক্ষতি হয়েছে। বন্যায় আউশের বীজতলার ক্ষতি হয় প্রায় ২০০ হেক্টর। সবজি ও বাদামের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
সুনামগঞ্জে ব্যবসার মধ্যে অন্যতম হলো বালু-পাথর। এসব বালু ও পাথর ব্যবসায়ীরা তুলে বড় বড় স্তূপ করে রাখেন নদীর তীরে। বন্যায় অনেকের বালু-পাথর ভেসে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যবসার নানা যন্ত্রপাতি।
সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) মোহাম্মদ রাজু আহমেদ বলেন, শ্রমজীবী, দরিদ্র মানুষের ঘরবাড়িরই বেশি ক্ষতি হয়েছে। সরকার পাশে না দাঁড়ালে মানুষ মহাবিপদে পড়ে যাবে।
সুনামগঞ্জের অর্থনীতি আগের গতিতে ফেরাতে সরকারের উদ্যোগের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
জেলা প্রশাসক আরও জানান, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘর-বাড়ির তৈরিতে প্রধানমন্ত্রী সুনামগঞ্জে ৫ হাজার ঘর নির্মাণের বরাদ্দ দিয়েছেন। যাদের ঘর একদম ভেঙে গেছে তালিকা করে তাদের ঘর নির্মাণের জন্য সহায়তা করা হবে। পর্যায়ক্রমে সবাইকে সহায়তা করা হবে।
তিনি বলেন, সড়ক, সেতু, কালভার্ট, গবাদিপশু, ফসল ও মাছের খামারের ক্ষতি হয়েছে তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র পেতে আরও এক মাস সময় লাগবে।