লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনার ৪৫ দিন পর কর্মস্থলে ফিরলেন নড়াইলের মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস।
বুধবার (৩ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে কলেজে যোগদান করেন তিনি। এসময় তাকে কলেজ গেটে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা। এদিন দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত কলেজে অবস্থান করেন তিনি।
শিক্ষককে বরণ করে নেওয়ার সময় নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য কবিরুল হক মুক্তি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক আব্দুস সালাম হাওলাদার, রেজিস্ট্রার মোল্যা মাহফুজ, পরিচালক (আইন) সিদ্দিকুর রহমান, পরিচালক (কলেজ মনিটরিং অ্যান্ড ইভালুয়েশন) রফিকুল আকবর, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুবাস চন্দ্র বোস, কলেজের সভাপতি অ্যাডভোকেট অচীন কুমার চক্রবর্তী, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহমুদুর রহমান, বিছালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হেমায়েত হোসেন ফারুক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
অধ্যক্ষকে বরণ করে নিতে সকাল থেকেই কলেজে অপেক্ষা করছিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের চার সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল। স্থানীয় সংসদ সদস্য বি এম কবিরুল হকের গাড়িতে বেলা ১১টা ৪৭ মিনিটে কলেজে আসেন অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস। এ সময়ে তার সঙ্গে ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সুবাস চন্দ্র বোসসহ রাজনৈতিক দলের নেতারা।
কলেজের প্রধান ফটকে তাঁকে গলায় ফুলের মালা পরিয়ে স্বাগত জানান কলেজের শিক্ষকরা। এরপর ফুলের তোড়া দিয়ে তাকে বরণ করেন কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি অচিন কুমার চক্রবর্তী। এরপর শিক্ষার্থীরা ফুলের মালা পরিয়ে পায়ে হাত দিয়ে তাকে প্রণাম জানায়।
ফুলের শুভেচ্ছায় সিক্ত হওয়ার পর স্বপন কুমারকে অধ্যক্ষের চেয়ারে বসিয়ে দেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিদলের কর্মকর্তা, স্থানীয় সংসদ সদস্য বি এম কবিরুল হক, কলেজের পরিচালনা পরিষদের কর্মকর্তা ও উপস্থিত অন্যান্যরা।
এসময় স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, দীর্ঘদিন পর কলেজে যোগদান করে খুব ভালো লাগছে। আমি পেছনের সবকিছু ভুলে যেতে চাই। সম্মানের সঙ্গে কাজে যোগদান করতে পেরে আজ আমি সত্যিকার অর্থে আনন্দিত।
সসম্মানে কর্মস্থলে যোগদানের সুযোগ করে দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শিক্ষামন্ত্রী, স্থানীয় এমপি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি দলের সদস্য, স্থানীয় প্রশাসনসহ সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন অধ্যক্ষ।
সহকর্মী শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ১৮ জুন আমি আপনাদের রক্ষা করতে পারিনি, নিরাপত্তা দিতে পারিনি। এজন্য ক্ষমা চাই। আশা করি এখন থেকে সবাই আমাদের পাশে থাকবে। সবার সহযোগিতায় কলেজের সার্বিক কার্যক্রম চালিয়ে যাবো। আশা করি এ ধরনের ঘটনা এই কলেজে আর ঘটবে না।
নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য কবিরুল হক মুক্তি বলেন, এ অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক-সম্প্রীতির উজ্জ্বল ইতিহাস রয়েছে। যারা এ ধরনের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টা করবেন তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সুস্পষ্ট কঠোর অবস্থান। তিনি আরও বলেন, অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের পাশে আছি, ভবিষ্যতও থাকবো।
মহানবীকে (সা.) কটূক্তিকারী ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বহিষ্কৃত নেত্রী নূপুর শর্মাকে প্রণাম জানিয়ে মির্জাপুর ইউনাইটেড কলেজের এক ছাত্র ফেসবুকে পোস্ট দেন। এ ঘটনায় গত ১৮ জুন কলেজ ক্যাম্পাসে এক সহিংস ঘটনা ঘটে।
ওই ঘটনার জেরে কলেজের অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসসহ কলেজছাত্র রাহুলকে পুলিশের সামনে জুতার মালা পরিয়ে কলেজ থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর কলেজ বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় মির্জাপুর পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) মুরসালিন বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ১৭০-১৮০ জনের নামে মামলা করেন। এ মামলায় এখন পর্যন্ত ৯ জন গ্রেফতার হয়েছেন। এরা সবাই এখন কারাগারে। এরমধ্যে মির্জাপুর কলেজেরই চার ছাত্র রয়েছেন।
এরপর দীর্ঘ ৩৬ দিন বন্ধ ছিল কলেজ। গত ২৪ জুলাই কলেজ খুললেও অধ্যক্ষ যাননি। এমনকী পার্শ্ববর্তী গ্রাম বড়কুলার নিজ বাড়িতেও ফেরেননি তিনি। তিনি নড়াইল শহর অথবা শহরতলীতে কোনো আত্মীয়ের বাড়িতে ছিলেন। অবশেষে দীর্ঘদিন পর বুধবার কলেজে ফিরলেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাস।