মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত রাজাকার জামাত নেতা দেলাওয়ার হোসেন সাঈদীর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছে আপিল বিভাগ।
বুধবার প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগ এ রায় দিয়েছে।
তার বিরুদ্ধে আনীত ১০, ১৬ ও ১৯ নম্বর অভিযোগের বিষয়ে আপিল বিভাগের এ রায় দিয়েছে। ১০ নম্বর অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তার ফাঁসির আদেশ দিয়েছিল। আর ৮ নম্বর অভিযোগে ১২ বছর এবং ৭ নম্বরে ১০ বছর কারাদণ্ডের আদেশ দেয় আপিল বিভাগ।
বুধবার আপিলের রায়: ১০, ১৬ ও ১৯ নম্বর অভিযোগে সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয় আপিল বিভাগ। ১০ নম্বর অভিযোগ বিসাবালিকে হত্যা, ১৬ নম্বর অভিযোগ তিন নারীকে অপহরণ করে আটকে রেখে ধর্ষণ এবং ১৯ নম্বর অভিযোগ প্রভাব খাটিয়ে ১০০-১৫০ হিন্দুকে ধর্মান্তরিত করা।
সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে ৬, ১১ ও ১৪ নম্বর অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে। ৬ নম্বর অভিযোগ লুণ্ঠনের, ১১ নম্বর হামলা ও লুণ্ঠনের এবং ১৪ নম্বর অভিযোগ ধর্ষণের।
৮ নম্বর অভিযোগের অংশবিশেষে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে সাঈদীকে খালাস দেয়া হয়। একই অভিযোগের অংশবিশেষে সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে তাকে ১২ বছর কারাদণ্ড দেয় আপিল বিভাগ। অষ্টম অভিযোগটি হত্যা ও অগ্নিসংযোগের।
এ ছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ মতে ৭ নম্বর অভিযোগে সাঈদীকে ১০ বছর কারাদণ্ড দেয় আপিল বিভাগ। সপ্তম অভিযোগ নির্যাতন ও বাড়ি লুণ্ঠনের পর অগ্নিসংযোগ।
৮ নম্বর (ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা) ও ১০ নম্বর অভিযোগের (বিসাবালি হত্যা) দায়ে সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল।
রায় নিয়ে প্রতিক্রিয়া:
অ্যার্টনি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, আশা করেছিলাম আগের আদেশ বহাল থাকবে। যদিও আইনে রিভিউ করার সুযোগ নেই। তবে বিশেষ বিবেচনায় যদি সম্ভব হয় তাহলে সেটা করা হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরীন আফরোজ বলেন, আদালতের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা রয়েছে, তবে আশা করেছিলাম সর্বোচ্চ শাস্তির। পূর্ণাঙ্গ রায় হাতে পেলে সাজা কমার কারণ বোঝা যাবে।
সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার সফিক আহমেদ বলেন, সর্বোচ্চ আদালতের রায়ের ওপর তার কিছু বলার নেই। এ রায়ে গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। এ রায় নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। উভয়পক্ষ রিভিউ আবেদন করতে পারবেন। তবে আদালত চাইলে।
আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহবুব হোসেন বলেন, এ রায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রণোদিত। এ রায় আমরা মানতে পারছিনা। পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি পাওয়ার পর রিভিউ আবেদন করা হবে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে মাহবুব হোসেন বলেন, সাঈদীকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য সাজা দেয়া হয়েছে।
বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বলেন, সর্বোচ্চ আদালতের মেনে নেয়া উচিত।
অনেক বেদনা নিয়ে এ রায় মেনে নিতে হবে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন।
আদালতে আসা সাঈদীর ছেলে সাংবাদিকদের বলেন, এ রায়ে আমরা সন্তুষ্ট নই। রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে পাওয়ার পর রিভিউ পিটিশন করা হবে। আশা করেছিলাম বাবা নির্দোষ হয়ে বের হয়ে আসবেন।
বুধবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের দৈনন্দিন কার্যতালিকায় এ মামলাটি রায়ের জন্য এক নম্বরে রাখা হয়।
বেঞ্চের অপর বিচারপতিরা হলেন- বিচারপতি এস কে সিনহা, বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।
এ রায়ের মধ্যদিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে মানবতাবিরোধী অপরাধের দ্বিতীয় কোনো মামলার চূড়ান্ত আপিল নিষ্পত্তি হলো।
সাঈদের আপিলের বিচারকাজ:
গত ১৬ এপ্রিল রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের আপিল আবেদনের ওপর শুনানি শেষে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (কোর্ট অ্যাওয়েটিং ভারডিক্ট-সিএভি) রাখে সর্বোচ্চ আদালত।
১৫ এপ্রিল (মঙ্গলবার) উভয়পক্ষের আপিল শুনানির চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। পরে পিরোজপুরে ইব্রাহিম কুট্টি হত্যার অভিযোগে স্বাধীনতার পর দায়ের হওয়া মামলায় দালাল আইনে গঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালের নথি তলবে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। অন্যদিকে একই মামলার বিচারিক আদালতের রেজিস্ট্রার খাতা তলবের আবেদন জানায় আসামিপক্ষ।
গত বুধবার আপিল বিভাগ ওই দুটি আবেদনই খারিজ করে সাঈদীর আপিল আবেদন রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় দুটি হত্যার দায়ে গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ফাঁসির দণ্ডাদেশ দেয়।
সাঈদীরে বিরুদ্ধে ২০টি অভিযোগের মধ্যে ইব্রাহিম কুট্টি ও বিশাবালী হত্যা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে আগুন দেয়ার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। তবে আসামিপক্ষের দাবি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া ইব্রাহিম কুট্টি হত্যা মামলার আসামিই ছিল না সাঈদী।
ইব্রাহিম কুট্টির স্ত্রী মমতাজ বেগম ১৯৭২ সালে স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে পিরোজপুরে একটি মামলাও করেছিলেন। ওই মামলায় ১৩ জনকে আসামি করা হয়। আসামির তালিকায় সাঈদীর নাম নেই বলে দাবি করে আসামিপক্ষ।
মমতাজ বেগমের করা ওই মামলার এফআইআর নথির একটি সত্যায়িত কপি ২০১১ সালে ট্রাইব্যুনালে জমা দেয়া হয়।
ট্রাইব্যুনালের রায়:
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে গত বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। বিচারপতি এ টি এম ফজলে কবীরের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এ রায় দেয়।
সাঈদীর বিরুদ্ধে গঠিত ২০টি অভিযোগের মধ্যে আটটি অভিযোগ প্রমাণিত হয়। এগুলো হলো: ৬, ৭, ৮, ১০, ১১, ১৪, ১৬ ও ১৯ নম্বর অভিযোগ।
এর মধ্যে ৮ ও ১০ নম্বর অভিযোগ হত্যার, ১৪ ও ১৬ নম্বর অভিযোগ ধর্ষণের এবং ১৯ নম্বর অভিযোগ ধর্মান্তরিত করা। বাকিগুলো নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও লুণ্ঠন এবং এ ধরনের অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ।
অষ্টম অভিযোগ হলো একাত্তরের ৮ মে ইব্রাহিম কুট্টিকে হত্যা এবং পিরোজপুরের পারেরহাট এলাকায় হিন্দুদের ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ।
১০ম অভিযোগ হলো, একাত্তরের ২ জুন বিসাবালীকে হত্যা এবং উমেদপুর হিন্দুপাড়ার ২৪টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ।
১৪ নম্বর অভিযোগ অনুসারে, মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে সাঈদী হোগলাবুনিয়ার হিন্দুপাড়ায় এক নারীকে ধর্ষণ ও বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করেন।
সাঈদীর বিরুদ্ধে ১৬ নম্বর অভিযোগ: ছিল—তিন নারীকে অপহরণ করে আটকে রেখে ধর্ষণ।
ধর্মান্তরিত করার ১৯তম অভিযোগ: সাঈদী প্রভাব খাটিয়ে পারেরহাটসহ অন্য গ্রামের ১০০-১৫০ হিন্দুকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করেন।
সাঈদীর বিরুদ্ধে ষষ্ঠ অভিযোগ, মাখনলাল সাহার ২২ সের স্বর্ণ লুট করার, সপ্তম অভিযোগ মুক্তিযোদ্ধা শহীদুল ইসলাম সেলিমকে নির্যাতন ও তার বাড়ি লুণ্ঠনের পর অগ্নিসংযোগ
১১তম অভিযোগ ছিল—মুক্তিযোদ্ধা মাহাবুবুল আলম হাওলাদারের বাড়িতে হামলা ও লুণ্ঠন।
ইব্রাহিম কুট্টি ও বিসাবালীকে হত্যার দায়ে সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের দুটি, ধর্মান্তরিত করার একটি এবং লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতনের তিনটি অভিযোগ প্রমাণিত হলেও দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়ায় অন্য অভিযোগগুলোতে আলাদা করে কোনো দণ্ড দেয়া হয়নি।
সাঈদীর বিরুদ্ধে গঠিত ১ থেকে ৫ এবং ৯, ১২, ১৩, ১৫, ১৭, ১৮ ও ২০ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। এর মধ্যে গণহত্যার চারটি (২, ৪, ১২, ১৫), ধর্ষণের দুটি (১৭ ও ২০) ও হত্যার (১, ৫, ১৩ ও ১৮) চারটি অভিযোগ। বাকি দুটি অভিযোগ লুটপাটের।
উল্লেখ, মানবতাবিরোধী অপরাধে গত বছর ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্র্রাইব্যুনাল-১। তার বিরুদ্ধে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগসহ ৮টি অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়।
রায়ে সাঈদীর বিরুদ্ধে গণহত্যাসহ ১২টি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ওইসব অভিযোগ থেকে তাকে খালাস দেয়া হয়। ওই সব অভিযোগে ন্যায়বিচার পেতে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আপিল করা হয় গত বছরের ২৮ মার্চ। একই দিন অভিযোগ থেকে অব্যাহতি ও দণ্ড থেকে খালাস চেয়ে আপিল করে সাঈদের আইনজীবী।
একই বছরের ৩ এপ্রিল আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল আবেদনের সারসংক্ষেপ জমা দেয় সরকারপক্ষ। এরপর ১৬ এপ্রিল সারসংক্ষেপ জমা দেয় আসামিপক্ষ।