‘জাতিসংঘ সনদের আলোকে’ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাধান চায় বাংলাদেশ। এই যুদ্ধ নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন গণমাধ্যমে কথা বলেছেন। তিনি জানান, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান দরকার। তাতে মৃত্যুর সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতি কমানো যাবে। এজন্য জাতিসংঘ সনদের আলোকে এই সংকটের সমাধান হওয়া উচিত বলেও মনে করে বাংলাদেশ।
বৃহস্পতিবার নিউ ইয়র্কে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ পূর্ব ইউরোপের ওই যুদ্ধ পরিস্থিতি ‘পর্যবেক্ষণ করছে’।
“মহামারিতে ক্ষত-বিক্ষত বিশ্ব ভয়ঙ্কর যুদ্ধ দেখতে আগ্রহী নয়। বাংলাদেশও উদ্ভূত পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি চায় এবং সেটি হতে পারে জাতিসংঘ চার্টারের আলোকে।”
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীন হওয়া ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট নেটোতে যোগ দিতে চায়, যা নিয়ে রাশিয়ার ঘোর আপত্তি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা ইউক্রেনকে সমর্থন দিচ্ছে, এ নিয়ে উত্তেজনা চলছিল গত সাড়ে তিন মাস ধরেই।
পূর্ব ইউক্রেনে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিয়ন্ত্রিত দুই অঞ্চল দোনেৎস্ক এবং লুহানস্ককে রাশিয়া স্বাধীন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দিলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছায়।
বৃহস্পতিবার সকালে ওই এলাকায় সামরিক অভিযানের ঘোষণা দেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। আর এর মধ্যে দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রথমবারের মত ইউরোপে এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের বড় ধরনের কোনো যুদ্ধের সূচনা হয়।
এর জবাবে রাশিয়ার ব্যক্তি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে চলেছে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের পশ্চিমা মিত্ররা। সামগ্রিক পরিস্থিতিতে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরাও।
রাশিয়ার সহযোগিতা নিয়েই পাবনার রূপপুরে নির্মিত হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের নিষেধাজ্ঞার কারণে ওই প্রকল্প কোনো জটিলতায় পড়বে কি না- সে প্রশ্নও আসছে।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে সরাসরি কোনো উত্তর দেননি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন। তিনি বলেন, “আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। আশা করছি কূটনৈতিক প্রক্রিয়ায় সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে।”
ইউক্রেনের প্রায় সব দিক থেকে স্থল ও আকাশ পথে রুশ বাহিনীর হামলা শুক্রবার দ্বিতীয় দিনেও অব্যাহত আছে। রাজধানী কিয়েভেও গোলাবর্ষণ হচ্ছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা আটকে পড়েছেন। তারা উদ্ধারের আকুতিও জানাচ্ছেন। এদের বেশিরভাগই শিক্ষার্থী।
দেশটিতে বাংলাদেশের কোনো দূতাবাস না থাকায় পোল্যান্ডের ওয়াশতে বাংলাদেশের দূতাবাস থেকে তাদের সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
দূতাবাসের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, “পোল্যান্ড-ইউক্রেন সীমান্ত প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা ছাড়া উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্র বৈধ পাসপোর্টধারীরা সীমান্ত রক্ষী বাহিনীকে পাসপোর্ট দেখিয়ে পোল্যান্ডে ঢুকতে পারবেন।”
তবে আরও অনেক বাংলাদেশি আছেন, যারা নানা কারণে অনিবন্ধিত। তাদের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়েও ওয়ারশ মিশনকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
“কাগজপত্রহীনরা পোল্যান্ডে যাওয়ার পর যাতে বাংলাদেশে ফিরতে পারেন সে ব্যবস্থাও করা হবে।”
বর্তমানে সরকারি সফরে নিউ ইয়র্ক অবস্থান করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। জাতিসংঘে ‘গ্যালভানাইজিং মোমেন্টাম ফর ইউনিভার্সাল ভ্যাকসিনেশন’ বিষয়ক একটি উচ্চ পর্যায়ের সভায় তার অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
বৃহস্পতিবার জাতিসংঘ সদরদপ্তরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি (পিজিএ) আব্দুল্লাহ শাহিদের সঙ্গে বৈঠক করেন মোমেন। তবে সেখানে ইউক্রেন পরিস্থিতি নিয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার ঢাকায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমও পরিস্থিতি ‘পর্যবেক্ষণ’ করার কথা বলেছিলেন।
তিনি বলেন, “লার্জলি আমাদের পজিশন হল, নন ইন্টারফেয়ারেন্স। এবং বিশ্বে যখন এই পরিস্থিতি তৈরি হয়, দুটি পক্ষ তৈরি হয়ে যায়, তখন দুইপক্ষ এসে শুধু বাংলাদেশ নয়, সবদেশের কাছে তাদের অবস্থানগুলি স্পষ্ট করবেন।
“বিশেষ করে যে দেশগুলো অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ পজিশন মেইনমেইন করে, তারই ধারাবাহিকতায় তারা কথা বলেছে, নাথিং রং। আমাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছি পহেলা ফেব্রুয়ারির স্টেটমেন্টের আলোকে।”
ইউক্রেইন সীমান্তে রাশিয়ার সৈন্য সমাবেশ নিয়ে পশ্চিমাদের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে গত ১ ফেব্রুয়ারি এক বিবৃতিতে ‘আলোচনার ভিত্তিতে’ সমস্যার সমাধান করতে সবপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল বাংলাদেশ।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, “যে কোনো রিজিওয়নে, বাংলাদেশ বিশ্বাস করে যে, শান্তি ও স্থিতিশীলতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এবং সেটা কেবল ওই অঞ্চলের জনগণের জন্যই নয়।”
সেখানে বলা হয়, “ইউক্রেইনে সম্প্রতি সংঘাত বাড়ার ঘটনায় বাংলাদেশ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এই ধরনের সংঘাত পুরো অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতাকে চরমভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
“এ কারণে আমরা সবপক্ষকে সর্বোচ্চ মাত্রার সংযম, দ্বন্দ্ব নিরসন এবং সংকট সমাধানে কূটনীতি ও সংলাপের পথ ফেরার প্রচেষ্টা নেওয়ার আহ্বান জানাই।”
সরকারের বিবৃতিতে বলা হয়, ওই অঞ্চলের পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাওয়ায় অর্থনীতিতে সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টিও বাংলাদেশ পর্যালোচনা করছে।