রাশিয়া-ইউক্রেনের মাঝে যুদ্ধ শুরু হয়েছে দুই দিন হল। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট বলেছেন এ পর্যন্ত যুদ্ধে তাদের মারা গেছেন ১৩৭ জন। এই হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমান কোথায় যেয়ে থামবে তা বলা মুশকিল।
কেননা পরমানু শক্তিধর দেশ রাশিয়াকে ইউরোপ বা আমেরিকা আঘাত করলেই আরেকটি বিশ্ব যুদ্ধ বেধে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সমর বিশেষজ্ঞরা। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদও পেরে উঠবে না রাশিয়ার সাথে। কেননা রাশিয়া নিজেরই ভেটো ক্ষমতা আছে। ৫ ভেকো ক্ষমতাধর দেশের একটি রাশিয়া। তাছাড়া তার সাথে থাকবে চীনও। তাই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র পশ্চিমা দেশগুলোর নেতাদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ।
এই যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে-বিপক্ষে নানা বক্তব্য দিচ্ছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। যুদ্ধ শুরুর আগে অনেক দেশ রাশিয়াকে দেখে নেবো বলে হুমকি দিলেও দিন শেষে তারা ইউক্রেনের পাশে দাড়ায়নি। তাই ইউক্রেন প্রেসিডেন্ট দু:খ প্রকাশ করে বলেছেন, রুশ বাহিনীর সামনে তাদেরকে অসহায় অবস্থা রেখে দিয়েছে বিশ্বনেতারা।
গেল কয়েক দিন যাবত বিশ্বনেতারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা শ্লোগান তুললেও কার্যত তারা রাশিয়ার কিছুই করতে পারছে না। কেননা পুতিনের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিলে তা রাশিয়ার চেয়ে ইউরোপকেই বেশি ক্ষতিতে ফেলবে।
আন্তর্জাতিক নানা গণমাধ্যম যুদ্ধ শুরুর দুই দিনের মাথায় এ সব হিসাব-নিকাশ করা শুরু করেছে।
এ সব গণমাধ্যম বলছে, রাশিয়ার গ্যাসের পাইপ বন্ধ করে দিয়েছে জার্মানী এতে রাশিয়ার চেয়ে বড় ক্ষতিতে পড়তে যাচ্ছে গোটা ইউরোপ। কেননা রাশিয়ার গাস ছাড়া তারা অনেকটা অচল।
বিশ্বে জ্বালানী তেল উৎপাদনে শীর্ষে রয়েছে সৌদি আরব। এর পরই দ্বিতীয় অবস্থানে আছে রাশিয়া। তাই বিশ্বে তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এমন নানা কারণে বিশ্বের অন্য পরমাণু শক্তিধর দেশগুলোকেও এই ইস্যুতে ভাবাচ্ছে বলে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই প্রতিবেদনে সাংবাদিক ক্রিশ্চিয়ান রোমান্সের বিশ্লেষণ বলছে, নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাশিয়াকে আটকাতে পারবে না কোন দেশ। তাতে সাপে বর হবে।
তাছাড়া প্রতিবেশি কিছু দেশ সরাসরি রাশিয়ার পক্ষ নিয়েছে। অন্যদিকে মুখে মুখে আর নিষেধাজ্ঞার শ্লোগান ছাড়া ইউক্রেনের পাশে নেই কোন দেশ।
কিয়েভের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এতদিন হুমকি-ধমকি দিয়ে আসা পশ্চিমারা নীরব দর্শক হয়ে আছে। বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থনে অভিযানের নামে চলমান রুশ আগ্রাসনের সামনে অন্য কোনো রাষ্ট্র সমরাস্ত্র নিয়ে সামনে দাড়ায়নি। আর সম্মিলিত পাল্টা হামলা হলে এ সংঘাত বহুদূর গড়াবে। এমন নানা অংক নিয়ে ভাবছেন বিশ্ব নেতারা। কেননা এখানে জড়ালে পুরো পৃথিবীতে নেমে আসতে পারে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ! ঘনিয়ে আসতে পারে পরমাণু যুদ্ধের মতো মহাবিপর্যয়ও।
এরই মধ্যে বেলারুশসহ কয়েকটি শক্তিশালী দেশ প্রত্যক্ষ সহায়তাও দিচ্ছে রাশিয়াকে। কিন্তু কিয়েভের পক্ষে এখনও পর্যন্ত কেউ নেই। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন রাশিয়ার সাথে যুদ্ধে জড়াবে না যুক্তরাষ্ট্র।
ন্যাটোর মতো বড় সামরিক জোট ও শক্তি হাতে থাকার পরও কিছুই করতে পারছে না পশ্চিমারা।
সিএনএন-এর ঐ প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও রাশিয়াকে শাস্তি দিতে গেলে পশ্চিমারা নিজের পায়ে কুড়াল মারবে। এর চড়া মূল্য দিতে হবে তাদের। ভুগতে হবে দীর্ঘমেয়াদে। এক কথায় মস্কোকে শাস্তি দিলে সেই শাস্তি পশ্চিমাদেরই ঘাড়ে এসে পড়বে। কেননা, সৌদি আরবের পরে রাশিয়া সবচেয়ে বড় জ্বালানি উৎপাদনকারী। দেশটির তেল ও গ্যাসে প্রায় আসক্ত আমদানিকারক দেশগুলো। আর শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নই তাদের চাহিদার এক-তৃতীয়াংশের বেশি প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল। এমন পরিস্থিতির মধ্যেও নর্ড স্ট্রিম-২ গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্প স্থগিত করেছে জার্মানি। আসলে এটি এক ধরনের নাটক। কারণ, সম্প্রতি রাশিয়ার সাবেক এক প্রেসিডেন্ট টুইটার পোস্টে বলেছেন, এমন বিশ্বে আপনাদের স্বাগত। শিগগির ইউরোপকে প্রতি এক হাজার ঘনমিটার প্রাকৃতিক গ্যাস কিনতে হবে দুই হাজার ইউরোতে।
ইউক্রেনের দুটি বিদ্রোহী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিরাপদ ও সবচেয়ে কার্যকরী অস্ত্র হিসেবে ভাবা হলো নিষেধাজ্ঞা আরোপকে। এ জন্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হলো রাশিয়ার ধনকুবের ও ব্যাংকসহ বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে। তাদের বিশ্বাস, এতে রুশ অর্থনীতিতে ধস নামবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে রপ্তানি বাণিজ্য। পরিশেষে এর জন্যও চরম মাশুল দিতে হবে পশ্চিমাদেরই। কারণ, নিষেধাজ্ঞার কারণে ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম লাফিয়ে বাড়তে শুরু করেছে, পৌঁছে গেছে গত আট বছরের শীর্ষে। আর রুশ জ্বালানির সবচেয়ে বড় গ্রাহক পশ্চিমারা। এসব দেশের নাগরিকরা জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির জন্য তাদের নেতাদের মসনদ কাঁপিয়ে দিতে পারেন। প্রভাব পড়তে পারে আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোর আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে। এ বিষয়গুলো পরোক্ষভাবে রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে পশ্চিমা নেতাদের হাত বেঁধে ফেলেছে বলে মনে করেন সিএনএনের রাজনীতি বিশ্নেষক জশ রোগিন-ও। তারপরও রাশিয়ার ওপর প্রথম দফার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। এই পদক্ষেপের ভার তাদের নাগরিকদেরও বইতে হবে বলে স্বীকার করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।
জশ রোগিন বলেন, জ্বালানির বাজার প্রভাবিত করতে রাশিয়ার কাছে অনেক বিকল্প উপায় আছে। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পশ্চিমাদের সক্ষমতা সীমিত। পশ্চিমা নেতাদের এসব দুর্বলতার পাঠ পুতিন ভালো করেই অধ্যয়ন করেছেন। তা ছাড়া রাশিয়ার বিরুদ্ধে সম্মিলিত হামলার সুযোগ নেই। এমন সিদ্ধান্তের জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী পাঁচ সদস্য দেশের অনুমোদন লাগবে। যেখানে মস্কোর নিজেরই ভেটোর ক্ষমতা আছে। পাশে আছে অন্যতম ঘনিষ্ঠ মিত্র চীন। তাদেরও ভেটোর ক্ষমতা আছে। গণতান্ত্রিক পদক্ষেপের এই পদ্ধতিও পুতিনের পক্ষে। সার্বিক বিবেচনায় মহাবিপর্যয় এড়াতে রাশিয়াকে আঘাত করা সম্ভব নয়।