মুক্তিযুদ্ধের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আলবদর কমান্ডার কামারুজ্জামানের ফাঁসি শনিবার রাত ১০.৩০ মিনিটে কার্যকর করা হয়েছে। মরদেহ অ্যাম্বুলেন্স করে গ্রামের বাড়ি শেরপুরে নেয়া হবে।
চার দশক আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির রশিতে ঝোলানো হলো যুদ্ধাপরাধী মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে। একাত্তরে যার নৃশংসতাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালের নাৎসি বাহিনীর পাশবিকতার সঙ্গে তুলনা করেছে আদালত।
মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এ নিয়ে দুই জনের ফাঁসি কার্যকর করা হলো। এর আগে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রাতে আরেক জামাত নেতা কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করে সরকার।
ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনরা আছাদুজ্জামান মিয়া জানান, রাত ১০টা ৩০ মিনিটে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
ফাঁসির মঞ্চে যারা ছিলেন:
এ সময় ফাঁসির মঞ্চে ও কারাগারের ভেতরে ছিলেন কারা মহাপরিদর্শক সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন, অতিরিক্ত আইজি প্রিজন কর্নেল কবির, ডিআইজি (প্রিজন) গোলাম হায়দার, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মো. ফরমান আলী, জেলার নেসার আলমসহ অন্য কারা কর্মকর্তারা।
প্রস্তুতি:
এর আগে রাত সাড়ে ৯টার দিকে কারা অভ্যন্তরের প্রবেশ করেন তারা।
কারা সূত্র জানা যায়, নিয়ম অনুযায়ী কামারুজ্জামানের প্রথম স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়, এরপর তাকে তওবা পড়াতে মৌলভীকে নিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট ‘প্রিজন কেবিনে’ প্রবেশ করেন।
সন্ধ্যায় এ জামাত নেতার সঙ্গে তার পরিবারের সদস্যরা দেখা করে বেরিয়ে আসার পর কারা ফটক এবং আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। কর্মকর্তাদের ভেতরে ঢোকার ঘটনাই ইঙ্গিত দিচ্ছিল, রাতের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড রাতেই কার্যকর হবে।
এরপর এক এক করে কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কারা অভ্যন্তরে ঢুকতে দেখা যায়।
রাত পৌনে ৯টার দিকে ঢাকার জেলা প্রশাসক তোফাজ্জল হোসেন মিয়া এবং ঢাকার সিভিল সার্জন আব্দুল মালেক মৃধা কারাগারের ভেতরে প্রবেশ করেন।
তার আগে র্যা বের গোয়েন্দা শাখার প্রধান আবুল কালাম আজাদ, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার শেখ নাজমুল আলম প্রবেশ করেন।
এর আগে সন্ধ্যা পৌনে ৭টার দিকে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন্স) সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন আহমদ কারাগারে ঢোকার পরপরই নাজিমুদ্দিন রোডে যান চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়। জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক মো. ফরমান আলীসহ অন্য কারা কর্মকর্তারাও ছিলেন ভেতরে।
ফাঁসির আসামি কামারুজ্জামানের জন্য শেষ পদক্ষেপ ছিল রাষ্ট্রপতির প্রাণভিক্ষা। অনেকটা সময় নিয়ে শেষমেশ তিনি আর প্রাণভিক্ষা না চাওয়ায় কারা কর্তৃপক্ষ ফাঁসি কার্যকরের সব প্রস্তুতি শেষ করে। জোরদার করা হয় সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা। নির্ধারিত হয়ে হয় জল্লাদ ও তার সহযোগীদের নাম।
অনুলিপি কারাগারে:
কারা সূত্রে জানা গেছে, কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো নির্বাহী আদেশের অনুলিপি কারাগারে পৌঁছানোর পর তাকে (কামারুজ্জামান) পড়ে শুনানো হয়।
নিরাপত্তার স্বার্থে তা গোপন রাখা হয়। দফায় দফায় বৈঠক করে ফাঁসি কার্যকরের সময় উপস্থিত থাকতে প্রথা অনুযায়ী সিভিল সার্জন, জেলা প্রশাসন ও পুলিশের প্রতিনিধির নামও চুড়ান্ত হয়।
ওই সময় কারা কর্তৃপক্ষ ফাঁসি কখন কার্যকর হবে তা নিশ্চিত করে বলেনি। তবে গতরাতেই স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শনিবার রাতে ফাঁসি কার্যকর হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
দণ্ডাদেশ কার্যকরের নির্বাহী আদেশও কারাগারে পৌঁছায়। ফাঁসির পর কিভাবে মরদেহ হস্তান্তর ও দাফন হবে সে ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। আসামির সঙ্গে স্বজনরাও শেষ দেখা করেন।
কে এই কামারুজ্জামান
কামারুজ্জামান একাত্তরে আলবদর বাহিনীর বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সংগঠক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালে শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুর গ্রামে গণহত্যা ও মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফাকে হত্যার দায়ে ২০১৩ সালের ৯ মে কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২।
রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন কামারুজ্জামান। এরপর ২০১৪ সালের ৩ নভেম্বর আপিল বিভাগের তৎকালীন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি (বর্তমান প্রধান বিচারপতি) সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে চার বিচারপতির বেঞ্চ তার আপিল আংশিক মঞ্জুর করেন। তবে সোহাগপুর গণহত্যার দায়ে কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডাদেশ সংখ্যাগরিষ্ঠের মতে বহাল রাখা হয়। আর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফাকে হত্যার দায়ে কামারুজ্জামানকে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আপিল বিভাগ।
আপিল বিভাগের ওই বেঞ্চের অপর তিন বিচারপতি ছিলেন- বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী।
পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হলে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি কামারুজ্জামানের মৃত্যু পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল-২। পরদিন ট্রাইব্যুনাল-২ মৃত্যু পরোয়ানায় সই করে কারাগারে পাঠালে কামারুজ্জামানকে তা পড়ে শোনানো হয়। ৫ মার্চ ফাঁসির রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করেন কামারুজ্জামান। গত ৬ এপ্রিল কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদন খারিজ করে মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখেন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার সদস্যের ওই বেঞ্চ।
বদর কমান্ডার থেকে শিবির সভাপতি
জামাতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ১৯৫২ সালের ৪ জুলাই শেরপুর সদর উপজেলার বাজিতখিলায় জন্ম নেন। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন জামাতে ইসলামীর তখনকার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের ময়মনসিংহ জেলার প্রধান।
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর ২২ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতা করতে জামালপুরের আশেক-মাহমুদ কলেজের ইসলামী ছাত্রসংঘের বাছাই করা নেতাকর্মীদের নিয়ে আলবদর বাহিনী গড়ে তোলেন তিনি। এই বাহিনী সে সময় ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, শেরপুর ও টাঙ্গাইলে ব্যাপক মাত্রায় যুদ্ধাপরাধ ঘটায়।
স্বাধীনতার পরের বছর ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন কামারুজ্জামান। ১৯৭৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে থেকে মাস্টার্স পাস করার পর সামরিক শাসক জিয়াউর রহমনের আমলে ১৯৭৮-৭৯ সালে ইসলামী ছাত্র শিবিরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
১৯৭৯ সালের অক্টোবরে কামারুজ্জামান মূল দল জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন এবং ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর রুকনের দায়িত্ব পান।
১৯৮২-১৯৮৩ সালে তিনি জামাতে ইসলামীর মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামের নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্বেও ছিলেন।
একসময় জাতীয় প্রেসক্লাবের সদস্য পদে থাকলেও যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরুর পর গণজাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন মহলের দাবির মুখে তাকে বহিষ্কার করা হয়।
১৯৯২ সাল থেকে তিনি দলে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্বে ছিলেন।
বিচার পরিক্রমা
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বহু প্রত্যাশিত বিচার কাজ শুরু হয়।
ওই বছর ২১ জুলাই কামারুজ্জামানের যুদ্ধাপরাধের তদন্ত শুরু করে প্রসিকিউশনের তদন্ত দল। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার অভিযোগে একটি মামলায় একই বছর ২৯ জুলাই তাকে গ্রেপ্তারের পর ২ অগাস্ট তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে কামারুজ্জামানের যুদ্ধাপরাধের বিচার শুরু হয়েছিল ২০১২ সালের ৪ জুন। প্রসিকিউশনের পক্ষে এ মামলায় তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৮ জন সাক্ষ্য দেন। আসামিপক্ষে সাক্ষ্য দেন পাঁচজন।
২০১৩ সালের ৯ মে হত্যা ও নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। এটি ছিল ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের তৃতীয় রায়।
ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে গত বছরের ৬ জুন আপিল করেন কামারুজ্জামান। গত ৫ জুন এ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। শুনানি শেষে গত ১৭ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগ রায় অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন। এর এক মাস ১৬ দিনের মাথায় রায় হয়।
গতকালে কিছু কথা:
এদিকে, গতকাল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকরের সব প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হলেও কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে রাতে কার্যকর হচ্ছে না। সন্ধ্যায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের প্রবেশ করেন জেলসুপার ফরমান আলী, কারা কর্তৃপক্ষ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ওই সময় কারাগারের ভেতর ও বাইরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।
গতকাল রাতে শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, কামারুজ্জামান প্রাণভিক্ষা চাননি— আর সময় দেয়া হবে না।
এদিকে, প্রাণভিক্ষা চাওয়া না চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিষ্পত্তি হওয়ার পরই যে কোনো সময় কার্যকর হবে যুদ্ধাপরাধী আলবদর কমান্ডার কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ডাদেশ, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির মঞ্চ তৈরি রাখা হয়।
দফায় দফায় বৈঠক করে নিরাপত্তা, দণ্ডাদেশ কার্যকরের জন্য জল্লাদ নির্বাচনসহ মরদেহ হস্তান্তরের ব্যবস্থাও নিয়ে রাখা হয়েছে।
কারা কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে সব প্রস্তুতি শেষ করে। ফাঁসি কার্যকরের মহড়াও শেষ। জোরদার করা হয় নিরাপত্তা, প্রস্তুত রাখা হয় ফাঁসির মঞ্চ। এমনকি নির্ধারিত হয় জল্লাদ ও তার সহযোগীদের নাম। নিরাপত্তার স্বার্থে তা গোপন রাখা হয়।
জেল সুপার ফরমান আলি ফাঁসি কখন কার্যকর হবে তা নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে এখনো বলেননি।
তবে কারা সুত্র মতে, প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি চাইবেন না, এ প্রশ্নে কামারুজ্জামান যে সময় চেয়েছেন, তা তাকে দেয়া হয়েছে। তার সিদ্ধান্ত জানতে দেখা করেছেন ম্যাজিস্ট্রেরা। এখন দণ্ড কার্যকরের আগে শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী হয়তো পরিবারের সদস্যরা আরেকবার কামারুজ্জামানের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ পাবেন।